ভ্যালেন্টাইনস স্পেশাল

ভ্যালেন্টাইনস স্পেশাল


বাসায় ফিরে ঘরে ঢুকে ভাঙাচোরা ড্রেসিংটেবিলটার উপর পন্ডস হোয়াইট বিউটির নতুন একটা বড় কৌটো আর চুলের একটা কাটা দেখতে পেয়ে খুব রেগে গেলাম আমি। এক সময় আমি এই ক্রিমটাই ইউজ করতাম কিন্তু এখন সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়া তে এই বিলাসিতা বাদ দিয়েছি। মাসের মাঝামাঝি তে এসে এই বাড়তি খরচ টা না করলে হত না আব্বার! কাঁধ থেকে ব্যাগ টা নামিয়ে টেবিলের উপর রাখলাম। আমার লম্বা চুলগুলোর খোপায় নতুন কাটা টা গুঁজে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই কিছুক্ষণ আগের রাগ টা নিমিষেই পানি হয়ে গেল। মনের অজান্তে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু হাসি টা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলাম না অযথা ৪০ টাকা খরচ হয়েছে ভেবে। ক্রিমের কৌটো টা হাতে নিয়ে আব্বার কাছে ছুটে গেলাম,
- আব্বা, তোমারে না বলছি এত দামী ক্রিম আমি ইউজ করবো না। তারপরও নিয়া আসছো কেন? আর সাথে আবার চুলের কাটাও কিনছো। কি দরকার ছিল খালি খালি এতগুলা টাকা খরচ করার?
আব্বা নিজের পুরনো জুতো জোড়াকে নতুন রুপ দেয়ার জন্যে কালি করায় ব্যস্ত ছিলেন। আমার কথা শুনে আমার দিকে তাকিয়ে শুকনো মুখে উত্তর দিলেন,
- আমার কাছে তো কালকে বাজার করারই টাকা নাই। আবার এইসব ক্রিম টিম কেমনে আনবো!
কথা শেষ করে আব্বা আবার জুতো কালির কাজে মন দিলেন।
ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,
- মানে কি? ক্রিম আর চুলের কাটা তুমি আনো নাই?
বাবা কোনো উত্তর দেয়ার আগেই মা রান্নাঘর থেকে চেঁচাতে লাগলেন,
- তানিশা, এইগুলা তন্ময় নিয়া আসছে।
আম্মা'র কথা শুনে আমি রান্নাঘরে উঁকি দিলাম,
- তন্ময় এইগুলা কই পাইছে?
কড়াইয়ে তেলের মধ্যে পেঁয়াজ কুচি আর রসুন কুচি নাড়তে নাড়তে আম্মা বললেন,
- পাড়ার ক্লাবে আজকে লুডু খেলার প্রতিযোগিতা ছিল। তন্ময় ফার্স্ট হইছে আর রফিক ভাইয়ের ভাগ্নি "নিশাত" সেকেন্ড হইছে। পরে পুরস্কার হিসাবে তন্ময় রে দিছিলো দুইটা গল্পের বই আর নিশাত রে দিছিলো এই ক্রিম আর চুলের কাটা। কিন্তু তন্ময় বইগুলা নিশাত রে দিয়া ওর কাছ থাইকা ক্রিম আর কাটা নিয়া আসছে।
- ওর না গল্পের বইয়ের খুব শখ? নিশাত রে দিয়া দিছে ক্যান তাইলে?
- এইডা আমারে জিগাইতাছোছ ক্যান? ওরেই জিগাইস।
- কই ও?
- দোকানে পাঠাইছি ডিম আনার জন্য।
ঘরে এসে ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেশ হতে চলে গেলাম।
তন্ময় আমার ছোট ভাই। আমার থেকে তিন বছরের ছোট। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। খুব কম কথা বলে, কিছুটা বদমেজাজি। ছোট হলেও আমার সাথে সবসময় বড় ভাইয়ের মত ব্যবহার করে। ওর আচার-আচরণ দেখে মনে হয় আমি ওর জাতশত্রু। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু কাণ্ড করে বসে যে মনে হয় আমিই হয়তো ওকে ভুল বুঝি সবসময়।
ফ্রেশ হয়ে এসে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি তিনটা মিসডকল এসেছে। ফাহাদ কল করেছিলো। আমি কলব্যাক করলাম,
- হ্যালো, কই থাকো তুমি তানিশা? কতবার কল দিলাম দেখছো?
- আরে আমি তো একটু আগেই বাসায় আসলাম। ওয়াশরুমে ছিলাম তাই রিসিভ করতে পারি নাই।
ফাহাদ কড়া সুরে জিজ্ঞেস করলো,
- আজকে এত লেট হইছে কেন বাসায় আসতে?
- জ্যাম ছিল অনেক আর আসার সময় বিন্দির আম্মুর সাথে রাস্তায় দেখা হয়ে গেছিলো। তারপর কথা বলতে বলতে একটু দেরী হয়ে গেছে।
- তোমাকে না কতদিন বলছি রাস্তায় কারো সাথে কথা না বলতে?
- আশ্চর্য, আমি কি বাচ্চা নাকি ফাহাদ? তুমি এইভাবে কথা বলতেছো কেন?
এবার আরো চওড়া গলায় কথা বললো ফাহাদ,
- তুমি উল্টা আমাকে প্রশ্ন করতেছো তানিশা! দিন দিন তোমার ভালোই উন্নতি হইতেছে তো!
আমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যেতে শুরু করলো।
তাই আর কথা না বাড়িয়ে বললাম,
- আমার মাথাব্যথা করতেছে খুব। পরে ফোন দিতেছি তোমাকে।
ফোনের লাইন টা কেটে লাইট অফ করে বিছানায় গিয়ে বালিশে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলাম।
ফাহাদের সাথে পারিবারিকভাবে আমার বিয়ের কথাবার্তা এগিয়েছে। যদিও এখনো দিনতারিখ ঠিক করা হয় নি। হয়ে যাবে খুব তাড়াতাড়ি। দুই পরিবারের সবাই রাজি। তাই আমাদের এই নিয়মিত যোগাযোগের ব্যাপার টা সবাই জানা সত্ত্বেও কেউ কোনো আপত্তি জানায় নি। তাছাড়া এখন তো বিয়ের আগে এসব দেখা সাক্ষাৎ খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। ফাহাদ মাস্টার্স পাশ করে এখন বাবার ব্যবসা দেখাশুনা করছে। উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। আমাদের পাশের এলাকাতেই থাকে। নম্র ভদ্র ছেলে হিসেবে এলাকায় তার খ্যাতি রয়েছে। সমস্যা শুধু একটাই, ফাহাদ খুব বদমেজাজি। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমার সাথে লেগে যায়। সবসময় আমাকে তার আয়ত্তাধীন রাখতে চায়। সে চায়,আমি তার ধরাবাঁধা নিয়মে চলি। বিয়ের আগেই স্বামীর কতৃত্ব ফলাতে চায়। তবে ফাহাদের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে,সারাদিন যাই হোক না কেন দিনশেষে সে আমার কাছেই ফিরে আসে। যতবারই মনমালিন্য হয়, সবসময় সে-ই আগে স্যরি বলে। বেশিক্ষণ আমার উপর রাগ পুষে রাখতে পারে না। তাই আমিও ওর ভাঁজে ভাঁজে থাকার চেষ্টা করি সবসময়। শুধু মাঝে মাঝে একটু ধৈর্য্যহারা হয়ে যাই।
ঘরের লাইট জ্বলে উঠলে আলো টা এসে আমার চোখে লাগলো। চোখ পিটপিট করে একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, আম্মা বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি উঠে বসলাম,
- কিছু বলবা আম্মা?
আম্মা আমার সামনে বসলেন,
- এই অসময়ে লাইট নিভাইয়া শুইয়া আছিস কেন? ভাত খাবি না?
- খাবো। মাথাব্যাথা করতেছিলো তাই একটু শুইছিলাম।
- ও। আয়, ভাত খাইতে আয়।
আম্মা উঠে যেতে নিলে আমি মায়ের হাত ধরে আটকালাম,
- আব্বার কাছে নাকি কালকে বাজার করার টাকা নাই? মাসের মাঝখানে এইবার টানাটানি লাগছে কেন?
আম্মা আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন,
- ওমা, গত সপ্তাহে তোর ফুফু তার শ্বশুরবাড়ির মেহমান নিয়া আসছিলো, ভুইলা গেছোস! তখন ভালমন্দ বাজার করা লাগছে। এখন তো তোর বাপের কাছে খালি কালকে অফিসে যাওয়ার বাসভাড়া টা আছে।
আমি উঠে গিয়ে ভ্যানিটিব্যাগ থেকে একটা ৫০০ টাকার নোট বের করে আম্মার হাতে গুঁজে দিলাম। আম্মা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন,
- এত টাকা কই পাইলি তুই?
- এই টাকাটা বই কেনার জন্য রাখছিলাম। কিন্তু এখনি তো আমার বই লাগতেছে না। এইটা আব্বারে দিয়া বলবা, কোনোরকমভাবে যেন এই মাস টা চালাইয়া নেয়। আমি দেখি আগামী মাসে আরো একটা টিউশনি ধরতে পারি কিনা। একটা টিউশনি তে বর্তমান সময়ে কিছুই হয় না। সবকিছুর খরচ বাড়তেছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খেতে যাওয়ার জন্য আবার তাড়া দিয়ে আম্মা চলে গেলেন।
মধ্যবিত্ত পরিবার আমাদের। বাবা একটা ছোটখাটো চাকরী করেন। কিন্তু এই চাকরীর বেতনে আমাদের চারজনের সংসার আগে কোনোমতে চললেও এখন আর চলে না। টানাটানি লেগেই থাকে। আমাদের দুই ভাই বোনের পড়াশুনার খরচ দিনদিন বাড়ছে। তার সাথে জিনিসপত্রের দাম তো আছেই। খুব হিসেব করে আম্মা সংসার টা চালান। তাই এখন হিসেবের বাইরে একটু খরচ হলেই হাহাকার লেগে যায়। আমি বাইরে টিউশনি করি এটা ফাহাদের পছন্দ না। তারপরও অনেক বলে কয়ে মাত্র একটা টিউশনি করার অনুমতি পেয়েছি। ক্লাস শেষে ওই টিউশনি টা করে একেবারে বাসায় ফিরি। কিন্তু এই একটা টিউশনি করে আমার পোষাচ্ছে না। মাসশেষে আম্মার হাতেও কিছু তুলে দিতে পারি না। তাই ভাবছি ফাহাদের অগোচরে আরেকটা টিউশনি শুরু করবো।
পরদিন ফাহাদ আমার ভার্সিটির সামনে আসে স্যরি বলার জন্য। রাতে আমি ফাহাদের কল রিসিভ করি নি দেখে ও ভেবেছিলো আমি রাগ করেছি। আসলে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ফাহাদ কে এটা বুঝতে না দিয়ে আমি ভাব ধরে থাকলাম। ওর স্যরি বলাটা উপভোগ করছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমিও স্বাভাবিক হয়ে গেলাম। বাইরে এসে দুজনে মিলে চা খাচ্ছি আর গল্প করছি। কথাপ্রসঙ্গে আমি ফাহাদ কে বললাম,
- এই জানো, তন্ময় কাল কি করছে?
- কি?
- লুডু খেলায় ও আর নিশাত পুরস্কার পাইছিলো। তন্ময় পাইছিলো বই আর নিশাত পাইছিলো একটা ক্রিম আর চুলের কাটা। কিন্তু তন্ময় নিশাতের সাথে পুরস্কার পাল্টাপাল্টি কইরা আমার জন্য ক্রিম আর কাটা নিয়া আসছে। অথচ দেখো, তন্ময়ের কিন্তু বই পড়ার শখ আছে।
- নিশাত টা কে?
- আমাদের পাশের বিল্ডিংয়ের রফিক চাচা কে চিনো না? উনার ভাগ্নি। তন্ময় আর ও সমবয়সী।
ফাহাদ একটা দুষ্ট হাসি দিয়ে বলে,
- দেখো গিয়া, নিশাতেরও বইপড়ার শখ আছে। তাই নিজের বইগুলা নিশাতরে দিয়া দিছে।
আজকালকার পোলাপান....
ফাহাদ কে থামিয়ে দিলাম আমি,
- আরে না, তন্ময় ওইরকম না। ও এইসব প্রেম ভালবাসার জগতে এখনো ঢুকতে পারে নাই।
- এহ,লাগে যেন সব জাইনা তুমি বইসা আছো। এখন ক্লাস সেভেনের পোলাগুলা "আই জাস্ট ওয়ানা ডাই ইউর আর্ম" ক্যাপশন দিয়া ফেসবুকে কাপল পিক আপলোডায় আর তোমার ভাই তো তাও ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।
ফাহাদের কথা শুনে আমি চুপসে গেলাম। অজান্তেই মন টা খারাপ হয়ে গেল। কাল ভেবেছিলাম, তন্ময় আমার কথা ভেবে ওই ক্রিম আর চুলের কাটা টা নিয়ে এসেছে। ধুর, আমি কি বোকা!
রাতে আব্বা আম্মা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর আমি তন্ময়ের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম, ও গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। ওর আবার রাত জেগে পড়ার অভ্যাস আছে। রান্নাঘরে গিয়ে চট করে তন্ময়ের জন্য এক গ্লাস দুধ গরম করে নিলাম। দুধের গ্লাস টা হাতে নিয়ে তম্ময়ের ঘরে ঢুকতেই তন্ময় বললো,
- আমি দুধ খাবো না এখন। যা এখান থাইকা।
আমি অবাক হলাম না। জ্ঞান হবার পর থেকেই তন্ময় আমার গতিবিধি অনুভব করতে পারে। আমি ওর আশেপাশে থাকলে ও কিভাবে যেন বুঝে যায়! আর এমন টা শুধু আমার ক্ষেত্রেই হয়। আর কারো টা তন্ময় বুঝতে পারে না। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, ও এইটা কিভাবে বুঝে। প্রতিবার ও রেগে গিয়ে একই উত্তর দিয়েছে,
"দেখ আমাশা, এক প্রশ্ন বারবার করবি না তো। তোর গায়ের গন্ধ আমার নাকের অলিগলি তে মিইশা গেছে। তাই তুই দশ হাত দূরে থাকলেও আমি টের পাই।"
তন্ময় রেগে গেলে আমাকে "আমাশা" বলে ডাকে। ঘরের মধ্যে তাও মানা যায়। কিন্তু বাইরের মানুষের সামনে খুব বিব্রতকর পরিস্থিতি তে পড়তে হয় আমাকে।
আমি তন্ময়ের কাছে এগিয়ে গেলাম,
- দুধ আনছি কেমনে বুঝলি?
বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে তন্ময় উত্তর দিলো,
- সামান্য দুধ গরম করতে গিয়া রান্নাঘরে যেমনে হাতুড়ি বাইড়ানোর মত শব্দ করতেছিলি, তাতে আমি কেন, আশেপাশের দশ বাড়ি পর্যন্ত সবাই বুইঝা গেছে যে আমাদের রান্নাঘরে দুধ গরম করা হইতেছে।
তন্ময়ের এসব ত্যাঁড়া বাঁকা কথাবার্তায় আমি অভ্যস্ত তাই কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ওর পাশের চেয়ারটায় বসলাম,
- দুধে চিনি মিশাইয়া দিছি।খাইতে পারবি।
দুধের গ্লাসটার দিকে একবার তাকিয়ে তন্ময় আবদার করে বসলো,
- ঠিক আছে, তাইলে আমি অর্ধেক আর তুই অর্ধেক, হ্যাঁ?
- আগে খাওয়া তো শুরু কর্।
তন্ময় দুধের গ্লাসে চুমুক দিলো। আমি আমার ডানগালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম,
- কালকে বইগুলা নিশাত রে দিয়া আমার জন্য ক্রিম আর কাটা নিয়া আসছিলি কেন?
তন্ময় কোনো উত্তর দিলো না। প্রশ্ন কমন না পড়লে উত্তর এড়িয়ে যাওয়া তার জন্মগত স্বভাব।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,
- নিশাত বই পড়তে ভালবাসে, তাই না?
এটা শুনে তন্ময় দুধের গ্লাস টা ধাম করে টেবিলের উপর রেখে দিলো। চোখ গরম করে জানতে চাইলো,
- এগুলা তোর পরাণের হবু স্বামী ফাহাদ তোর কানে ঢুকাইছে, না? নাইলে এমন প্যাঁচাইন্না চিন্তাভাবনা তো তোর মাথায় আসার কথা না।
- ঠিক কইরা কথা বল তন্ময়। দিনে দিনে বেয়াদব হইয়া যাইতেছিস তুই।
- এই, তোরে আমার ঘরে আসতে কে বলছে? আদর দেখাইতে আসছিলা নাকি জেরা করতে আসছিলা হিটলারের হবু বউ?
এই বাঁদড়টার সাথে রাত বিরাতে চেঁচামেচি করতে ইচ্ছে করছিলো না তাই আমি আর কোনো উত্তর না দিয়ে দুধের গ্লাস টা হাতে করে নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম,সেই সময় তন্ময় আমার হাত থেকে দুধের গ্লাস টা ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। তারপর বাকি দুধটুকু ঢকঢক করে গিলে প্রচণ্ড জেদ নিয়ে বললো,
- এই বাড়িতে তোর কপালে দুধ জুটবে না। ওই হিটলারের বাড়িতে গিয়াই দুধ ডিম গিলিস।
আমি আর এক মিনিটও দাঁড়ালাম না।
তন্ময় মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বলে যা একদম কলিজায় গিয়ে বিঁধে। ও আগে এমন করতো না আমার সাথে। ফাহাদের সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে ও এত রুক্ষ আচরণ করে। জানি না কেন, তন্ময় ফাহাদ কে একদম সহ্য করতে পারে না। এই বিয়েতে সবার মত থাকলেও তন্ময় প্রথম থেকেই রাজি ছিল না। এমনকি ফাহাদরা যেদিন আমাকে দেখতে এসেছিলো, সেদিনও তন্ময় আমাকে "না" করেছিলো যেন ওদের সামনে না যাই। কিন্তু শুধু ওর কথা মানতে গিয়ে গুরুজনদের কথা অমান্য করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাছাড়া ওর বয়স কম। এই বয়সে অকারণে বিরক্ত হওয়া, কাউকে অপছন্দ করা, কারো প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া এগুলো স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই তন্ময়ের ফাহাদ কে অপছন্দ করাটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিই নি আমি। ভেবেছি, সময়ের সাথে সাথে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এ তো দেখি দিন দিন বাড়ছে! তন্ময় তো রীতিমতো ফাহাদ কে তাচ্ছিল্য করে কথা বলে। আম্মাকে এই বিষয় টা অনেকবার দেখতে বলেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয় নি। আম্মা শুধু বলেন,
"আরে ও তো এমনি। আসল কথা হইলো, তোর বিয়ে হইয়া যাইতেছে দেইখা তন্ময়ের কষ্ট লাগতেছে। ভাবতেছে, ফাহাদ তোরে বিয়ের পর ওর কাছ থাইকা কাইড়া নিয়া যাবে। তাই ফাহাদ রে দুশমন ভাবতেছে এখন। বিয়ের পর এগুলা ঠিক হইয়া যাবে। তুই চিন্তা করিস না তো তানি।"
আম্মার কথাই হয়তো ঠিক। এত কিছু আমার মাথায় ঢোকে না। আমি যেমন সহজ সরল, আমার চিন্তা-ভাবনাগুলোও তেমন সহজ সরল।
একদিন দুপুরবেলা ভাত খাওয়ার সময় আম্মা কে বলছিলাম,
- আম্মা, আমার ঘরের ড্রেসিংটেবিল টা পাল্টাবা না? ছোট খালা যখন দিছিলো তখনি তো এইটার বেহাল দশা ছিল। এখন তো আরো খারাপ।
- আর কত টিকবো! তোর ছোট খালা ব্যবহার করছে ৭ বছর। তারপর নতুন ড্রেসিংটেবিল বানাইঁছে দেইখা তোরে দিয়া দিছে। তাও তো ম্যালা বছর হইছে।
- আব্বা রে বলো না, নতুন একটা কিনতে।
আমার প্লেটে ডাল দিতে দিতে আম্মা বললেন,
- আইচ্ছা দেখি, তোর আব্বা অফিস থাইকা আসুক তারপর।
তন্ময় সোফায় বসে টিভি দেখতে দেখতে ভাত খাচ্ছিলো। আমাদের কথা শুনে মাঝখান থেকে বলে উঠলো,
- তোর হিটলার রে বল না, নতুন ড্রেসিংটেবিল কিইনা দিতে। খালি খালি আব্বার উপর চাপাইতেছিস ক্যান?
মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আমার। আম্মা কে উদ্দেশ্য করে বললাম,
- দেখছো আম্মা, বদমাইশটার কথা শুনছো? শাসন না করতে করতে ওরে তোমরা বাদ বানাইতেছো। পরে অনেক ভুগবা, বইলা দিলাম।
তন্ময় ভাতের প্লেট হাতে নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর গলা উঁচিয়ে বলতে লাগলো,
- ওই আমাশা, কিসের শাসন, হ্যাঁ? ভুল কিছু তো বলি নাই আমি। আর আম্মা আব্বারে আমার জন্য ভুগতে হবে না। ভুগতে যদি হয় তাইলে তোর জন্য ভুগতে হবে।
অবাক হয়ে প্রশ্ম করলাম আমি,
- আমার জন্য মানে?
- হ তোর জন্যই। ওই হিটলার রে বিয়ে করার পর তোর যে মরণদশা হবে, ওইটা সামাল দিতে দিতেই আব্বা আম্মার নাকানিচোবানি খাইতে হবে। স্বাদে কি আর তোরে আমাশা ডাকি!
আমি এবার কাঁদো কাঁদো দৃষ্টি নিয়ে আম্মার দিকে তাকালাম,
- আম্মা, ওরে তুমি না করো আমারে যেন আমাশা না ডাকে।
এটা বলেই আমি কেঁদে ফেললাম। আমার কান্না দেখে তন্ময় আরো রেগে গিয়ে বললো,
- আরে আমি তো এখন খালি "আমাশা" ডাকি। বিয়ার পর এলাকার মানুষজন যখন "তামাশা" ডাকবো তখন দেখবো কত কান্না কানতে পারোছ তুই।
প্লেটের ভাতগুলো শেষ না করেই তন্ময় হাত ধুয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। এদিকে আম্মা অবাক হয়ে এতক্ষণ বায়স্কোপ দেখছিলেন। তন্ময় চলে যাওয়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন।
আব্বা অফিস থেকে ফেরার পর আমি সাধারণত চা আর মুড়ি নিয়ে আব্বার কাছে গিয়ে বসে থাকি। দুই বাপ মেয়ে মিলে চা খাই আর নানা বিষয় নিয়ে গল্প জুড়ে দিই। মাঝে মাঝে আব্বার চুল টেনে দিই, আরাম পেয়ে আব্বা আমার বকবকানি শুনতে শুনতেই ঘুমে তলিয়ে যান। আম্মা তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকেন। তেমনি এক সন্ধ্যেবেলা আমি আর আব্বা বসে গল্প করছিলাম, এমন সময় তন্ময় এসে আব্বা কে ডাকলো,
- আব্বা, তোমার সাথে আমার একটা কথা ছিল।
- কি কথা বল্।
- ১৪ তারিখে আমাদের কলেজ থাইকা পিকনিকে যাবে। ১৫০০ টাকা চাঁদা। জানি দিতে পারবা না, তারপরও জানাইয়া গেলাম।
তন্ময় আব্বার সাথে সবসময় মাথা নিচু করে কথা বলে। অন্য সবার সাথে দাদাগিরি দেখালেও বাবার সামনে সে যথেষ্ট ভদ্র থাকে।
কথাটা বলে তন্ময় চলে গেল।
আব্বার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মুখ গম্ভীর করে কি যেন ভাবছেন। আমি আব্বার কাঁধে হাত রাখলাম,
- কি ভাবতেছো আব্বা?
সম্বিত ফিরে পেয়ে আব্বা করুণ স্বরে বললেন,
- তোরা তো আমার কাছে কখনো মুখ ফুইটা কিছু চাস না। আজকে ছেলেটা প্রথমবারের মত কিছু চাইলো অথচ আমার দেওয়ার ক্ষমতা নাই।
- বেতন হইছে না তোমার?
- হ, বেতন তো কালকেই হইছে। কিন্তু এগুলা তো সব হিসাবের টাকা।
- এখান থাইকা তুমি ১৫০০ টাকা তন্ময় রে দিয়া দাও। এই মাসের বাজার খরচ টা আমি দেখবো নে।
- তুই কেমনে দেখবি?
- নতুন একটা টিউশনি নিছি। লাগলে এডভান্স নিতে পারবো। তুমি চিন্তা কইরো না। তন্ময় রে ডাক দাও।
আব্বা আমার কথায় আশ্বস্ত হয়ে তন্ময়ের হাতে ১৫০০ টাকা তুলে দিলেন। টাকা টা পাওয়ার পর খুশিতে তন্ময়ের চোখমুখ মুক্তোর মত চিকচিক করছিলো।
রাতে বারান্দায় বসে ফাহাদের সাথে কথা বলছিলাম,
- আচ্ছা তানিশা, ভ্যালেন্টাইন'স ডে' তে কই ঘুরতে যাবা?
- ইশ, বুড়া বয়সে ভ্যালেন্টাইন'স ডে সেলিব্রেট করবে। শখ কত!
- কারে বুড়া বলো! মাত্র ৩১ এ পা দিলাম। আর পুরুষ মানুষ কখনো বুড়া হয় না, বুঝছো?
আমি ম্লান হেসে জিজ্ঞেস করলাম,
- হ্যাঁ বুঝছি। কই নিয়া যাইতে চাও?
- তুমি যেখানে বলবা।
- নাহ, কই যাবা এইটা তুমি ঠিক কইরো। আমার একটা অন্য আবদার আছে।
- কি আবদার? এমন কিছু বইলো না যেটা আমি পছন্দ করবো না।
- উঁহু, ওইরকম কিছু না।
- আচ্ছা বলো।
- আমার খুব শখ ভ্যালেন্টাইন'স ডে তে একটা লাল টুকটুকে শাড়ি, লাল কাঁচের চুড়ি পইরা আর ঠোঁটে গাঁঢ় লাল লিপস্টিক দিয়া তোমার সাথে ঘুরতে বের হব।
- তাই? না করছে কে? পরবা...
আমি একটু মন খারাপ করলাম,
- কিন্তু আমার কোনো লাল শাড়ি নাই।
- ওহ, এই কথা। ঠিক আছে, আমি একটা লাল শাড়ি কিইনা দিবো নে।
মুহূর্তেই খুশিতে মনটা ভরে গেল আমার,
- হুম। আর কাচের চুড়ি?
- দিবো দিবো, চুড়িও কিইনা দিবো। লাল লিপস্টিক আছে তো? ম্যাচিং কানের দুল?
- কানের দুল আছে কিন্তু লিপস্টিক টা ভেঙে গেছে।
হঠাৎ করে তন্ময় পর্দা টেনে বারান্দায় উঁকি দিলো,
- ওই, তোর লুতুপুতু আর ওই হিটলারের ভুজুংভাজুং শেষ হইলে বলিস, তারপর আমি পড়া শুরু করবো।
আমি চমকে উঠলাম আবার ভীষণ লজ্জাও পেলাম। তার মানে তন্ময় এতক্ষণে আমার সব কথা শুনে নিয়েছে। ইশ,ভুলেই গিয়েছিলাম, তন্ময়ের ঘরের জানালা টা বারান্দার সাথে লাগোয়া।
কয়েকদিন পর বিকেলবেলা বাসায় ফিরে দেখতে পেলাম মাঝবয়সী একটা মেয়ে আম্মার সাথে কিভাবে যেন রেগে রেগে কথা বলছে। আম্মা কিছু বলতে চাচ্ছেন কিন্তু মেয়েটা বলতে দিচ্ছে না। আমি ওদের কাছে এগিয়ে গেলাম,
- কি হইছে আম্মা?
আমাকে দেখে আম্মা যেন একটু সাহস পেলেন,
- দেখ না তানি, এই মেয়ে তন্ময়ের নামে কিসব উল্টাপাল্টা বলতেছে।
আমি মেয়েটির দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম,
- কি করছে তন্ময়?
মেয়েটি আমাকে পালটা প্রশ্ন করলো,
- আপনি তন্ময়ের কি হন?
- আমি ওর বড় বোন।
এবার মেয়েটা কিছুক্ষণ আগের রূপে ফিরে গেল,
- জানেন, আপনার ভাই কি করছে? স্কুলের সব ছেলেমেয়েদের সামনে আমার ছোট বোন কে হুমকিধামকি দিয়া আসছে।
আমি আশেপাশে তাকিয়ে তন্ময় কে খুঁজতে লাগলাম। ড্রয়িংরুমে চোখ যেতেই দেখলাম, তন্ময় আয়েশ করে সোফায় বসে টিভি তে খেলা দেখছে।
- আপনার হয়তো কোথাও ভুল হইতেছে। আমার ভাই ওরকম না। আসলে...
- থামুন, আমাকে চেনাতে আসবেন না। কেমন বোন আপনি, ভাই কে সঠিক শিক্ষা দিতে পারেন না?
মেয়েটি আমার দিকে আঙুল তুলে আরো অনেক আজে বাজে কথা বলতে লাগলো। এর মধ্যে তন্ময় তেড়ে এসে আমাকে আড়াল করে মেয়েটির সামনে দাঁড়ালো,
- আর একবার আমার বোনের দিকে আঙুল তুইলা কথা বললে ওই আঙুল কাইটা ললি আইসক্রিমের কাঠি বানাইয়া বাসায় পার্সেল কইরা পাঠাইয়া দিবো। আর কি বলতেছিলেন যেন, আমার বোন আমাকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারে নাই, না? তা আপনি কি আপনার বোন কে ছেলে নাচানোর শিক্ষা দিছিলেন?
মেয়েটি ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
- মানে?
- মানে আপনার বোন এতটুকু বয়সেই পাক্কা খেলোয়াড় হয়ে গেছে। আমার বন্ধুর সাথে ১ বছর প্রেম কইরা তার কাছ থাইকা দামী দামী গিফট হাতাইয়া এখন আবার আরেক বড়লোক ছেলের পিছনে লাগছে। আর এইজন্যই আপনার বোন রে ভাল হইয়া যাওয়ার সুপরামর্শ দিয়া আসছিলাম স্কুলের সবার সামনে। আগে নিজের ঘর ঠিক করেন, তারপর পরের ঘরের খবর নিতে আসবেন। যান এখন...
তন্ময়ের ঝাড়ি শুনে ভয়েই হোক বা লজ্জা পেয়েই হোক মেয়েটি মাথা নিচু করে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। তন্ময় আবার পিছন থেকে ডাক দিলো,
- এই যে শুনেন, আমার বোন চাইলেই আপনার মত হইতে পারবে কিন্তু আপনি চাইলেও আমার বোনের মত হইতে পারবেন না। বুছঝেন?
মেয়েটি আর কোনো কথা না বলে দ্রুত প্রস্থান করলো।
দুইদিন পর সন্ধ্যার মাগরিবের আযানের সময় তন্ময় হুড়মুড় করে আমার ঘরে ঢুকলো,
- আমার সাথে চল এখনি।
আমি তখন মাত্র বাসায় এসে ড্রেস চেঞ্জ করেছি। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
- কই যাব? কি হইছে?
তন্ময় আমার কথার উত্তর না দিয়ে হাত ধরে টানতে শুরু করলো,
- আচ্ছা দাঁড়া, ওড়না টা তো নিতে দে। আর আম্মা কে বইলা যাবি না?
তন্ময়ের মাথা গরম হয়ে গেল,
- তুই বুঝতেছিস না আমার হাতে সময় নাই! কাউকে কিছু বলতে হবে না, চল আমার সাথে।
আমাকে এক প্রকার জোর করেই তন্ময় বাসা থেকে বের করে নিয়ে গেল। রিক্সা দিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর একটা টিনশেড হাফ বিল্ডিংয়ের সামনে রিক্সা থামালো তন্ময়।
রিক্সাভাড়া মিটিয়ে তন্ময় আমাকে বললো,
- এতদিন আমার হাতে কোনো প্রমাণ ছিল না,তাই জোর দিয়া কিছু বলতে পারি নাই। আজকে নিজের চোখেই দেইখা নে, যা ভিতরে যা।
- তন্ময়, তোর কথার আগামাথা কিছু বুঝতেছি না আমি। এইটা কার বাসা? আর ভিতরে কেন ঢুকবো?
- কথা বইলা সময় নষ্ট না কইরা ভিতরে যা তাড়াতাড়ি।
ধাক্কা দিয়ে তন্ময় আমাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। ভেতরে ঢুকে সামনে এগিয়ে যেতেই একটা ঘর থেকে বিশ্রী গোঙানির আওয়াজ শুনতে পেলাম। ঘরের দরজা টা হাল্কা ভেজানো ছিল। কোনো কিছু না ভেবে ধাম করে দরজা টা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকে গেলাম। তারপর যা দেখলাম তাতে আমি আমার নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ফাহাদ একটা মেয়ের উপর....ছিঃ। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
আমাকে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখে ফাহাদ তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে এসে জামাকাপড় ঠিক করলো। সে নিজেও স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমি শুধু মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়লাম। কারো মুখে কোনো কথা নেই। তন্ময় তার বন্ধুবান্ধব নিয়ে ইতিমিধ্যে হাজির হয়ে গেছে। ফাহাদ কে এলোপাথাড়ি কিল ঘুষি দিতে দিতে তন্ময় বলছে,
- আমার হাতে যদি ক্ষমতা থাকতো তোকে এইখানেই জ্যান্ত কবর দিতাম। আমার সহজ সরল বোনটারে তুমি এতদিন ধইরা ঘুরাইছো? আজকে দেখ, আমি তোর কি হাল করি।
তন্ময়ের বন্ধুরা না ফেরালে তন্ময় ফাহাদ কে খুনই করে ফেলতো।
বাসায় এসে ঘরের দরজা লাগিয়ে অনবরত কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম আমি। এ কাকে ভালবেসেছিলাম আমি! কাকে বিশ্বাস করেছিলাম! মানুষ এভাবে মুখোশ পরে থাকতে পারে! দুনিয়াটা এত খারাপ!
আম্মা পুরো কাহিনী জানতে চাইলে তন্ময় বলে,
- ওই মেয়েটা ফাহাদের মামাতো বোন। মামাতো বোনের সাথে ফাহাদের অবৈধ সম্পর্ক ছিল। ওর মামা মামী দুইজনই চাকরী করে। তারা অফিসে যাওয়ার পর ফাহাদ খালি বাসায় আসতো প্রায়ই। আমার বন্ধু ইমরান ওই পাড়াতেই থাকে তাই ও এই ব্যাপার টা জানতো। কিন্তু আমার কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না বইলা তোমাদের কে এতদিন বলতে পারি নাই। আর বললেও তোমরা বিশ্বাস করতা না। আজকে অনেক কষ্টে ফাহাদের মামার বাসার কাজের মেয়েটারে ১০০ টাকা দিয়া হাত করছিলাম। ওই কাজের মেয়েটাই আমাদের খবর দিছে। গেট খুইলা দিছে।
ফাহাদের এই ঘটনা পুরো এলাকায় রটে গেল। আব্বা বিয়েটা ভেঙে দিলেন। আত্নীয়-স্বজনরা ফোন দিয়ে বিস্তারিত শুনতে চাইলো। কেউ বা আবার কাটা গায়ে নূনের ছিটাও দিলো। আমি আমার ঘর থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম এক প্রতিবেশী আন্টি আম্মাকে বলছিলেন,
- যাই হোক না কেন আপা, মেয়েটার তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছিলো। পুরুষ মানুষের এমন দোষ থাকেই, তাই বইলা বিয়ে ভাইঙ্গা দেয়াটা আপনাদের ঠিক হয় নাই। এখন তো সবাই মেয়েটারেই অভাগী বলবে।
পাশের রুম থেকে তন্ময় ছুটে এসে ওই আন্টি কে উত্তর দিলো,
- লাগলে আমার বোনরে কাইটা টুকরা টুকরা কইরা গাঙে ভাসাইয়া দিবো তবুও ওই কমজাতের সাথে বিয়ে দিবো না। আর আপনি যে এত বড় কথা কথা বলতেছেন,আপনি পারবেন আপনার মেয়ে রে ওইরকম চরিত্রহীন কারো হাতে তুইলা দিতে?
ভদ্রমহিলা একদম চুপ হয়ে গেলেন।
আব্বা আম্মা হতাশ হয়ে পড়লে তন্ময় তাদেরকে বলে "শুকরিয়া আদায় করতে"। ও বুঝায়, যা হয়েছে ভাল হয়েছে। বিয়ের আগেই আমরা সবটা জানতে পেরেছি। বিয়ে টা হয়ে গেলে তো সর্বনাশ হয়ে যেত। আব্বা আম্মাও এটা ভেবে স্বস্তি পায়।
এভাবে সাতদিন কেটে গেল। আমি এখনো স্বাভাবিক হতে পারি নি বলে আব্বা আম্মা আমাকে নিয়ে খুব চিন্তিত। আমি সারাদিন ঘরে বসে থাকি। একা একা কাঁদি। কারো সাথে তেমন কথা বলি না। খাওয়াদাওয়া করি না। এই সাতদিনের মধ্যে একবারের জন্যেও তন্ময় আমার ঘরে আসে নি। এমনকি আমার সাথে কথাও বলে নি।রাতে কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নিজেও জানি না।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার বিছানার এক কোণায় একটা লাল টুকটুকে নতুন সুতি শাড়ি,লাল কাঁচের চুড়ি আর একটা লাল লিপস্টিক রাখা। শাড়ির ভাঁজে একটা চিরকুট দেখতে পেয়ে চিরকুট টা হাতে নিলাম। তাতে লিখা-
"এই আমাশা, শাড়ি টা পরে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। খুব সুন্দর করে সাজবি কিন্তু। আর হ্যাঁ লাল লিপস্টিকটাও দিবি। দশ মিনিট সময় দিলাম। জলদি কর।"
কি ভেবে যেন আমিও ফ্রেশ হয়ে এসে তাড়াহুড়ো করে রেডি হতে শুরু করলাম। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুচি ঠিক করছি,হঠাৎ করে মনে হল, আজ তো ১৪ তারিখ। তন্ময়ের না পিকনিকে যাওয়ার কথা! কুচি ঠিক করে তন্ময়ের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই তন্ময়ের সাথে একটা ধাক্কা খেলাম। হাতের কনুই চেপে ধরে বললাম,
- উফ, এত জোরে কেউ ধাক্কা দেয়?
- আমি কই ধাক্কা দিলাম! তুই ই তো কানার মত হাঁটতেছিলি!
- এই, তোর না আজকে পিকনিক ছিল?
- হুম ছিল।
- যাবি না?
- না।
- কেন?
- ইচ্ছা করতেছে না আর তাছাড়া টাকাও নাই।
অবাক হয়ে গেলাম আমি,
- ওইদিন না আব্বা তোরে টাকা দিলো। কি করছিস এতগুলা টাকা?
- লাল শাড়ি, লাল কাঁচের চুড়ি আর লাল লিপস্টিক কিনছি।
আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না তন্ময় পিকনিকের চাঁদার টাকা দিয়ে আমার জন্য এসব কিনে এনেছে। আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,
- এসব করতে গেলি কেন?
তন্ময় আমার গালে হাত দিয়ে কপাল কপাল ঠেকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো,
- হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন'স ডে। আমার বোনের খুশির কাছে এইসব পিকনিক টিকনিক সব তুচ্ছ।
তন্ময় কে জড়িয়ে ধরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি। আমি আমার সেই আগের ভাইটা কে ফিরে পেয়েছি। তন্ময়ের গায়ে কেমন যেন একটা "বাবা বাবা" গন্ধ পাচ্ছি।
তন্ময় আমাকে পাড়ার মেলা তে নিয়ে গেল। ওখানে আমরা নাগরদোলায় উঠলাম, গরম গরম জিলাপি খেলাম, ফুচকা খেলাম,চিতুই পিঠাও খেলাম শুঁটকি ভর্তা দিয়ে। তন্ময় আমাকে অনেকগুলো কাঁচের চুড়িও কিনে দিলো। ও জানে, কাঁচের চুড়ি আমার খুব পছন্দ। অনেক মজা করলাম আমরা।
সারাদিন ঘুরেফিরে বাসায় ফেরার সময় রিক্সায় বসে তন্ময় আমার হাত ধরে বললো,
- বুবুন, আজকে তুই অনেক খুশি না রে?
অনেকদিন পর তন্ময় আমাকে বুবুন বলে ডাকলো।
আমি প্রশস্ত হাসি দিয়ে দুই হাত ছড়িয়ে দেখালাম,
- হ্যাঁ এত্তগুলা খুশি।
- তাহলে আমাকে কথা দে, সারাজীবন এইভাবেই হাসিখুশি থাকবি। ফাহাদ নামের জানোয়ারটার কথা ভুলে নতুন উদ্যমে আবার সব কিছু নতুন ভাবে শুরু করবি। কথা দে আমায়। তোর কান্না আমি একদম সহ্য করতে পারি না রে।
তন্ময়ের ছলছল চোখজোড়া আমার নজর এড়ালো না। আমি ওকে কথা দিলাম, আজ থেকে আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করবো।
বাসায় ঢোকার সাথে সাথে বিরিয়ানির গন্ধে পেটে ছুঁচো দৌঁড়াতে আরম্ভ করে দিলো। আমাদের দেখে আম্মা বললেন,
- আসছিস তোরা, নে হাতমুখ ধুইয়া নে। আমার রান্না হইয়া গেছে প্রায়। তোদের আব্বাও আজকে অফিস থাইকা তাড়াতাড়ি চইলা আসছে।
তন্ময় ঘরে চলে গেলে আমি আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
- আম্মা, মাংস কে আনছে?
- কে আবার! তন্ময়। তোর বিরিয়ানি পছন্দ বইলা সকালে একটা মুরগী কিইনা আইনা আমারে বলছিলো, আজকে যেন বিরিয়ানি রান্না করি।
ঘরে এসে ফ্যানের নিচে বসে ভাবছি, জীবনে সুখী হতে বেশি কিছু লাগে না আসলে। তন্ময়ের মত এমন একটা ভাই পাশে থাকলে আর বাবা মায়ের স্নেহের হাত মাথার উপর সবসময় ছায়া হলে একটা জনম অনায়াসে পার করে দেয়া সম্ভব!
আমি জানি না, ভবিষ্যতে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে। জানি না, কতটা উত্তম জীবনসঙ্গী আল্লাহু আমার ভাগ্যে লিখে রেখেছেন। শুধু এতটুকু জানি, সেই জীবনসঙ্গী আমাকে যত ভাল সময়ই উপহার দিক না কেন, যত বিশেষ ভ্যালেন্টাইন'স ডে'ই কাটাই না কেন, আজকের ভ্যালেন্টাইন'স ডে'র মত এমন স্মরণীয় ভ্যালেন্টাইন'স ডে আমার জীবনে আর একটাও আসবে না।
(কাল্পনিক)
Nusrat Khan Ani

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.