অপরিচিত
অপরিচিত
গভীর রাত, ঝিঝি পোকাদের আওয়াজ ও থেমে গেছে। গাছের পাতাগুলো শুধু ঘুমোয় নি, বাতাসের দোলায় দুলছে আর পতপত আওয়াজ করছে। অরুনিতা বিছানায় আধশোয়া হয়েই ঘুমিয়ে গেছে, লাইট জ্বলছে, টেবিলে বইখাতাও খোলা পড়ে আছে। হঠাৎ ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দে ঘুম ভেঙে গেল অরুনিতার। এই মোবাইল ফোনটা বড্ড বেশি বেশি জ্বালাচ্ছে আজকাল। যখন তখন ভাইব্রেট করে ওঠে।
ফোনটা হাতে নিয়েই দেখে টেক্সট মেসেজ এসেছে। পঞ্চম বারের মত সেই একই নম্বর থেকে টেক্সট এসেছে। টেক্সটে লিখা "সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর এক নম্বর সারির চার নম্বর তাকের তিন নম্বর বইতে একটি চিঠি আছে। নিয়ে যাবে প্লিজ"। কে লিখছে এই মেসেজগুলো, কেইবা তাকে চিঠি দিচ্ছে, এসব উদঘাটন করার চেষ্টা করে ব্যর্থ অরুনিতা। নম্বরটায় কল যায়না, টেক্সট করলে উত্তরও আসে না। চিঠিগুলো অবশ্য জমিয়ে রেখেছে সে। চিঠি বলতে কেবল কবিতা। প্রতিটি চিঠিতে একটি করে কবিতা ছিল। প্রথম কবিতাটি ছিল,
"অব্যক্ত কথার যন্ত্রণা তুমি বোঝো?
রুদ্ধ করে হৃদয়ের দ্বার,কাকে অমন খোঁজো?
নিরবে ভালবাসে সয়েছি রিপুর উপহাস,
তাই এসেছি তোমার হাতে দেখতে নিজের সর্বনাশ!"
রুদ্ধ করে হৃদয়ের দ্বার,কাকে অমন খোঁজো?
নিরবে ভালবাসে সয়েছি রিপুর উপহাস,
তাই এসেছি তোমার হাতে দেখতে নিজের সর্বনাশ!"
কবিতা খুব পছন্দ অরুনিতার। কবি কবি ছেলে অরুনিতার পছন্দ। এর আগেও একটা ছেলেকে পছন্দ হয়েছিলো। কবিতা লিখতো, লম্বা চুল ছিল, উদাস হয়ে হাঁটতো। ছেলেটাকে সে খুব লক্ষ্য করতো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ছিলো। "আচ্ছা! সে কোনভাবে আমাকে লক্ষ্য করে নি তো! হতে পারে আদতে সেই এসব চিঠি পাঠাচ্ছে!" মনে মনে বলতে থাকে অরুনিতা আর শিহরিত হয়। এরপর আরো চারটি চিঠি এসেছে। প্রত্যেক চিঠিতেই কবিতা লেখা। বেশ পাকা হাতে লেখা। হতে পারে তার লেখার হাত ভালো, নয়তোবা সে গভীর প্রেমে পড়েছে।
২য় চিঠিঃ
ভাব হবে তোমার সনে, স্বপ্ন বুকে বোনা
লহর খেলবো তোমার গলে, হয়ে প্রেমের গয়না
বাতাসে তোমার গন্ধ মেশা, মাতাল হওয়ার প্রকোপ
সিদ্ধ করতে প্রেমের সমীকরণ, চিন্তা পেল লোপ।
ভাব হবে তোমার সনে, স্বপ্ন বুকে বোনা
লহর খেলবো তোমার গলে, হয়ে প্রেমের গয়না
বাতাসে তোমার গন্ধ মেশা, মাতাল হওয়ার প্রকোপ
সিদ্ধ করতে প্রেমের সমীকরণ, চিন্তা পেল লোপ।
৩য় চিঠিঃ
ভাল থাকি তোমায় আঁকি হৃদয় ক্যানভাসে
লজ্জাবতীর আগার মতন লুকাও পরশে,
বাহার খেলে রঙিন ঠোঁটে আমার অলীক আশা
সিক্ত করো হৃদয় প্রাচীর, বোঝো মনের ভাষা।
ভাল থাকি তোমায় আঁকি হৃদয় ক্যানভাসে
লজ্জাবতীর আগার মতন লুকাও পরশে,
বাহার খেলে রঙিন ঠোঁটে আমার অলীক আশা
সিক্ত করো হৃদয় প্রাচীর, বোঝো মনের ভাষা।
৪র্থ চিঠিঃ
ইচ্ছেঘুড়ি বানিয়ে তোমায় উড়াই আমার আকাশে
তিলে তিলে জমাই তোমায় বুকে প্রেমের পরশে
ইন্দ্রজীৎ নই আমি জিততে চাই শুধু তোমায়
মুখের কথা মুখে থাকুক, হৃদয় যেন না হারায়।
ইচ্ছেঘুড়ি বানিয়ে তোমায় উড়াই আমার আকাশে
তিলে তিলে জমাই তোমায় বুকে প্রেমের পরশে
ইন্দ্রজীৎ নই আমি জিততে চাই শুধু তোমায়
মুখের কথা মুখে থাকুক, হৃদয় যেন না হারায়।
চারটে চিঠির পর বেশ কিছুদিন চিঠি দেয়া বন্ধ ছিলো। অরুনিতা প্রায় অস্থির হয়ে পড়েছিলো। পঞ্চম চিঠির মেসেজ টা এলো বহুদিন পর। মেসেজ পাওয়ার পরদিনই অরুনিতা হাজির সেন্ট্রাল লাইব্রেরীতে। প্রথম সারির চতুর্থ তাকের তিন নম্বর বইটি ছিল 'Fundamentals of Mathematical Statistics By S.C. Gupta' বইয়ের ঠিক একশো তেতাল্লিশ নম্বর পৃষ্ঠায় একটা চিঠি। ধবধবে সাদা কাগজের চিঠি। চিঠির ব্যক্তিগত রঙ সাদা, লেখাগুলো কালো অথচ সেই কালো কালিই সবচেয়ে বেশি রঙ ছড়ায়। অরুনিতা চিঠি হাতে নিয়ে দেখলো, ওতে ছোট্ট করে লেখা "কাল বিকেলে নীল হলুদ শাড়িতে থাকা যাবে আকাশমনির হাটে? আমি আসবো"। অরুনিতার মন হঠাৎ করে মোচড় দিয়ে উঠলো। এতদিন যাকে দেখার আকাঙখায় মন হাহাকার করত, তাকে দেখার সুযোগ আসায় কেন এমন ভয় হচ্ছে সেটা বুঝে আসেনা অরুনিতার। নিজেকে সামলে নিয়ে বাসায় চলে আসে অরুনিতা।
সে বলেছে হলুদ শাড়িতে যেতে, কিন্তু ওর কোন হলুদ শাড়ি নেই। মা আর বড় আপুর কাছে খোঁজ করেও হলুদ শাড়ি না পেয়ে খুব মন খারাপ হল অরুনিতার। শেষে একটা নীল শাড়ি পরে নিজেকে আয়নায় দেখে সে। আজ কেন যেন নিজেকে অসুন্দর লাগছে তার কাছে। হয়ত তার প্রত্যাশা ছিল তাকে আরো সুন্দর দেখাবে, কিন্তু সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় তার কাছে নিজেকে ভাল লাগছেনা। এদিকে বিকেল প্রায় হয়ে এসেছে। তাই তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে ক্যাম্পাসের একমাত্র ক্যান্টিন 'আকাশমনির হাটে' চলে আসে অরুনিতা।
বসে বসে অপেক্ষার প্রহর গোণে স্বপ্নের মানুষের। আধঘন্টা কেটে গেলেও কেউ আসেনা। হঠাৎ নিজের বিভাগের জুনিয়রকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে ফেলে অরুনিতা। ছেলেটার নাম ইমু। ছেলেটা অতিরিক্ত চঞ্চল, এই অতিরিক্ত চাঞ্চল্যের জন্যে ছেলেটাকে ভাল লাগেনা অরুনিতার। কিন্তু বিভাগের বড় আপুকে দেখে এক দৌড়ে এসে বেঞ্চিতে পাশে বসে সালাম দিল ইমু। আদিখ্যেতা ধরণের কথাবার্তা বলতে লাগলো। এক পর্যায়ে সে জিজ্ঞেস ই করে ফেললো, "কি আপু! একেবারে সেজেগুজে বসে আছেন? আসবে নাকি কেউ?"
"না ভাইয়া। কেউ আসবে না। আমি তোমার সাথে পরে কথা বলি?"
"আচ্ছা আপু।" বলে পেছন ঘুরে হাঁটা ধরল ইমু। অরুনিতা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন। ইমু উঠে যেতেই ইমুর বসার জায়গাটায় এক টুকরো কাগজ দেখলো অরুনিতা। সে কাগজ হাতে নিয়ে দেখলো ওতে লেখা,
"না ভাইয়া। কেউ আসবে না। আমি তোমার সাথে পরে কথা বলি?"
"আচ্ছা আপু।" বলে পেছন ঘুরে হাঁটা ধরল ইমু। অরুনিতা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন। ইমু উঠে যেতেই ইমুর বসার জায়গাটায় এক টুকরো কাগজ দেখলো অরুনিতা। সে কাগজ হাতে নিয়ে দেখলো ওতে লেখা,
"প্রচন্ড মোহভরা চোখ তোমার, নেশা নেশা হাসি,
কবিতার আদ্যক্ষরে তোমাকে ভালবাসি"
কবিতার আদ্যক্ষরে তোমাকে ভালবাসি"
এটা পড়ে কিছুক্ষণের জন্য অরুনিতার মাথা শূন্য হয়ে গেল। তারপর কিছু একটা মনে আসতেই চট করে ব্যাগ থেকে চিঠি গুলো বের করল সে। প্রতিটি চিঠির কবিতাগুলোর আদ্যক্ষর মিলিয়ে দেখলো সে। তারপর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। এ এক অদ্ভুত স্তব্ধতা, বহুবছর কেটে গেলেও বোধহয় চারিদিক সচল হবেনা।

কোন মন্তব্য নেই