বাবার অভিমান

বাবার অভিমান 

মাঝে মাঝে বাবার নাম্বারে ফোন করি। নাম্বারটা এখন বন্ধ, তবুও করি। ভাললাগে আমার এই বন্ধ নাম্বারে কল দিয়ে ফোনটা কানে লাগিয়ে রাখতে ।
পাঁচবছর পর, একদিন খুব সকালে বাড়ি থেকে ফোন পাই। ওপাশ থেকে কেউ একজন "এখন বাসায় আস" বলে কলটা কেটে দেয়! দীর্ঘ পাঁচবছর পর আসা এই ডাকটা আমার কাছে মহা আনন্দের হতে পারত, কিন্তু ভয়ংকর এক আতঙ্ক নিয়ে আমি ছুটে যাই।
এই পাঁচবছর কতদিন কতরাত শুধু ফোনটার দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে একটা মিরাকল ডাক শোনার অপেক্ষায় থেকেছি! অপেক্ষায় থেকে থেকে ঘুমিয়ে গেলেও স্বপ্নে দেখতাম, একটা দরাজ গলা ফোনে আমাকে ভাত খেয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করছে, রাতে আমাকে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে বলছে, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে সেটাও বলছে ফোন করে, নতুন লাগানো গাছটার ডাল কে যেন ভেঙ্গে দিয়েছে সেই নালিশও দিচ্ছে!!
ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখতাম, চোখের পানিতে বালিশ ভিজিয়ে ফেলেছি আমি! গভীর রাতে প্রিয় সেই নাম্বারটাতে ছুঁয়ে দিতাম, ফোন করা নিষেধ ছিল।
কি ভয়ংকর এক অভিমান আমাকেও আটকে রাখত!!
আজ সকাল সকাল সেই বাড়ি থেকে ডাক এসেছে। দীর্ঘ পাঁচ পাঁচটা বছর অপেক্ষা করার পর ডাক এসেছে! আমি অবশ হয়ে বিছানার উপর কতক্ষণ বসে ছিলাম মনে নায়। আমার দু বছরের মেয়েটা হটাত কেঁদে উঠে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি শুধু। মেয়েকে কোলে নিয়ে কান্না থামানোর কথা একদম ভুলে যাই! মেয়ের দিকে আমি তাকিয়ে দেখতে দেখতে ভাবছি, এখন কি আমার এমন করে কাঁদা উচিৎ?
মেয়ের কাঁদার শব্দে ওর বাবার ঘুম ভেঙ্গে যায়, সে আমার তাকিয়ে থাকা দেখে অবাক হয়! মেয়েকে শান্ত করাতে করাতে সে এসে আমার পিঠে হাত রাখে, প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি কথা বলার মত শক্তি বা ভাষা খুঁজে পাইনা। তবুও ছোট্ট করে বলি, "চল বাবাকে দেখে আসি "।
বাবাকে দেখতে গিয়ে দেখি অনেক অনেক মানুষের ভিড় আমাদের ছোট্ট বসার ঘরটাতে। আমি রুমে ঢুকার পর সবার দৃষ্টি একসাথে আমার উপর এসে পড়ল, যেন সবাই এতক্ষণ আমার অপেক্ষাতেই ছিল!
আমি দেখতে পাই, মেঝেতে কার্পেটের উপর বিছানো খাটিয়াতে বাবা শুয়ে আছে। কি শান্ত একটা মুখ ! অথচ এই মুখটার সামনে দাঁড়াবার সাহস হয়নি এই দীর্ঘ পাঁচ পাঁচটা বছর!! কতদিন পর... এত কাছে আসতে পেরেছি! যেন কত যু...গ পর! এত কাছে আসার আনন্দে আমার কান্না আসছে কিন্তু আমি কাঁদতে পারছি না।
আমি বাবাকে ছুঁয়ে দেখার লোভ সামলাতে পারিনা।
মুখে ছুঁয়ে দেখি, ঠিকমত ঘুমাও না? মুখটা এত শুকিয়ে গেছে কেন!
হাতে ছুঁয়ে দেখি , কত দিন লোশন দাও না তুমি!
পা ছুঁয়ে দেখি, পায়ের নখ কে কেটে দিত বাবা!
মাথায় হাত দিয়ে দেখি, চুল অনেক পাতলা গেছে কেন!
ঠিক কতক্ষণ ধরে একটা নিষ্প্রাণ শরীর হাতড়ে একটু উষ্ণতার খোঁজ করেছি জানিনা , কেউ একজন আমাকে হাত ধরে টেনে দাঁড় করায়। কেউ কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেও দেখি। কিন্তু আমি ঠিক কেন এবং কিভাবে কাঁদব বুঝতে পারিনা। আমি কাউকে চিনতে পারছিনা। আমি ঘোলা চোখে শুধু দেখি অনেক গুলো ঝাপ্সা ঝাপ্সা মুখ আমাকে আদর করছে, আমার জন্য কাঁদছে। আমাকে এত মানুষ ভালবাসে আজকেই জানলাম!
অসংখ্য গুনগুন নিচু গলার ফিসফাস শব্দ আমার মাথায় জটলা পাকাচ্ছে। আমি টলমলে পায়ে এ ঘর ও ঘর হাঁটছি। আমার ঘরটা আগের মতোই আছে। অনেক অনেক বছর আগে লাগানো লাল নীল প্রজাপতি আঁকা জানালার পর্দাটা এখনো ঝুলছে! দেয়ালে লাগানো প্রিয় লেখকের পোস্টার, কাগজের ফুল পাতার স্টিকার, ডানাভাঙা প্রজাপতি সবাই আগের জায়গামতই বসে আছে!! দেয়ালের রঙটাও মনে হচ্ছে কিছুদিন আগে করা হয়েছে!! শেষবার বিছানাটি কি এদিকে ঘুরিয়ে রেখেছিলাম! আমি আবার কিছুদিন পর পর বিছানা এদিক ওদিক করে রাখতাম তাই ভুলে গেছি। কিছুই মনে পড়ছেনা আমার। মাঝখানে যেন অনেক হাজার বছর কেটে গেছে!! বুকশেলফটাও সেই আগের জায়গাতে আছে, গল্পের বইগুলোর উপর যে ধুলো পড়ার কথা!
একটুও ধুলোবালি নাই কোথাও!! মনে হচ্ছে প্রতিদিন একবার করে ঝাঁট দেয়া হয়, আমি নাই তাতে কি!! একটু আগেই যেন আমি এই রুম থেকে বেড়িয়ে গেছি এমন ভাবে রুমটা গুছানো আছে!! আমি মাথা ঘুরিয়ে দেখছি আর আমার নাকে সেই ছোট্ট বেলার গন্ধটা এসে লাগল!
আমার কানে ছোট্ট বেলার সেই দরাজ গলার ডাক "অফুত...অমা"!!
মা র গলার বকা, ধমক!! রান্নাঘরের বিকট শব্দে কিছু পড়ে যাবার ঝন ঝন শব্দ, নষ্টকল থেকে অবিরাম টিপ টিপ করে পড়া পানির শব্দ, বারান্দা থেকে আসা পাখীর ডাক...!! একসাথে ঢুকছে... আর বেরুচ্ছে ......উফ !! কি ব্যাথা ! আমি কান চেপে এক দৌড়ে বের হয়ে যাই।
বাবার রুমে কয়েকজন মিলে কথা বলছিল। আমাকে দেখতে পেয়ে কথা থামিয়ে সরে দাঁড়াল। আমি বাবার পড়ার টেবিলটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঠিক যেমনটা পিকনিকের আগের রাতে বা অন্যায় আবদার করার জন্য গিয়ে দাঁড়াতাম, টেবিলের সাথে পেটটা চেপে ধরে।
চশমাটা একপাশে আছে, খোলা বইটা উলটানো। মনেহয় কালরাতে বেশী খারাপ লাগছিল দেখে অর্ধেকটা পড়ে রেখে দিয়েছে। লোকমান চাচা বলল, রাতে নাকি ভাল মত কিছু খায়নায় বাবা, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে । সকালে উঠতে দেরী হচ্ছে দেখে ঘুম থেকে ডাকতে গিয়ে দেখতে পায় নিথর বাবাকে।
ভীষণ ক্লান্ত লাগছে আমার। কেউ একজন মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদার জন্য বলছে আমাকে। আমার এখন কাঁদার মত শক্তি নাই। আমি বাবার সাদা ধবধবে বিছানায় শুয়ে পড়েছি।
এইতো সেদিনও ঘুম না আসলে মাঝরাতে বাবার বিছানায় এসে শুয়ে পড়তাম। মাঝরাতে বালিশ নিয়ে পা টিপে টিপে বাবার রুমে ঢুকে বাবার পাশে শুয়ে পড়তাম।
বাবা গভীর ঘুম থেকে চোখ না খুলেই বলত, "আরেকটু এদিকে আয় পড়ে যাবি"।
আহ!! কি শান্তির ঘুমটাই না হত বাবার এই বিছানায় !! কি যে আছে জানি না এই জাদুর বিছানাতে!!
বাবাকে একদিন বলেছিলাম, "বাবা তোমার এই খাটকে রিসার্চে পাঠানো উচিৎ। এটা চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটা বিরাট সাফল্য যোগ করবে। ইনসোনোমিয়া রোগীদের জন্য একটা যুগান্তকারী ঔষধ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পারবে তোমার এই খাট"!!
আমার কথা শুনে বাবা খাট কাঁপিয়ে হো হো করে হাসত। বাবার হো হো হাসির শব্দে পুরো খাট, পুরো রুম দুলে দুলে উঠত আর আমি সেই দুলুনিতে রাজ্যের ঘুম চোখে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতাম।
ঠিক কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। কেউ একজন আমার গায়ে হাত দিয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গাল। বাবাকে বিদায় দিতে হবে। বাবা ঠিক কোথায় দাফন হবে সব কিছু আগে থেকে ঠিক করা ছিল।
সবাই চোখ মুছছে, কেউ কেউ হু হু শব্দ করে কাঁদছে! কেউ কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে আমি একা , এতিম হয়ে যাবার দুঃখে কাঁদছে! কেউ কেউ আবার আমার বাবা মা কেউ নাই, এই পৃথিবীতে আমার কেউ নাই এসব বলে বিলাপ করছে!! কেউ কেউ আবার আমার বাবার সব কিছুর মালিক আমি সেই কথাটাও করুন ভাবে অন্যজনকে বলছে! শুধু আমার স্বামীকে দেখছি সারাক্ষণ ওর মেয়েকে বুকের সাথে ধরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছে, শুনছে আর ভেজা শান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে !!
বাবা চলে যাচ্ছে । আমাকে কেউ একজন বলল ক্ষমা করে দিতে বাবাকে এবং ক্ষমা চাইতে বাবার কাছ থেকে! দুনিয়ার সব রাগ, সব অভিমান থেকে মুক্ত করে দিতে বাবাকে!
আমি সবার সব কথাকে ছুড়ে ফেলে শুধু বাবার হাত ধরে শব্দ করে বল্লাম,
"ভালবাসি বাবা। জানি অনেক পুরনো কথা। অনেক বার, অ...নে...ক বার বলেছি। তবুও আজ আবার বলছি, তোমাকে অনেক অনেক অনেক ভালবাসি আমি। আমাকে একা ফেলে কোথাও যেওনা... প্লি...জ "।
ওরা তবুও আমার নির্বাক বাবাকে নিয়ে যাচ্ছিল!!
আমি একদৌড়ে ছাদে চলে এসেছি। ছাদ থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ওরা বাবাকে শুইয়ে দিচ্ছে। ছাদ থেকে স্পষ্ট দেখছি, ওরা বাবাকে একা ফেলে চলে আসছে!! যেমন করে আমি একদিন চলে গিয়েছিলাম অভিমান করে বাবাকে একা ফেলে!!
আমি আমার বাবার মতোই বিচ্ছিরি রকমের ভয়ংকর অভিমানটা পেয়েছিলাম জন্ম সূত্রে! অভিমানের সাথে অভিমানের প্রতিযোগিতায় বাবা জিতে গেল অবশেষে!! আমাকেই হারতে হলো, হেরে ফিরে আসতে হলো আবারো বাবার কাছে!!
আমি ছাদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবার সাথে কথা বলছি, "তুমি কত দূর যাবে বাবা? এইতো আমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখবো। আমার সাথে লুকোচুরি খেলায় তুমি জিততে পারবে বুঝি!! আমি ঠিক খুঁজে বের করে ফেলবো তোমাকে। হা হা"!!
লোকমান চাচা কবে যে এসে আমার মাথায় হাত রেখেছে বুঝতে পারিনি। লোকমান চাচা বলছে, "ভাইজান বলেছে এই জায়গাতে কবর দিতে। উনি আমাকে বলে গিয়েছে, "এখানে কবর হলে, আমার মেয়ে আমাকে দেখতে পাবে যখন ইচ্ছে করবে"!! ভাইজান আরো বলেছে, "আমার মেয়েকে কাঁদতে দিবিনা লোকমান। আমার মা হারা মেয়েকে আমি কোনদিন কাঁদতে দিই নি । খবরদার আমার মেয়ে যাতে কোনদিন না কাঁদে, তুই শুধু এটা দেখে রাখবি"।
আমি তাকিয়ে দেখি , লোকমান চাচা হাউমাউ করে কাঁদছে। আমার মেয়ের বাবাটা তাঁর মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিতে দিতে কাঁদছে। মেয়েটা তার বাবার কান্না দেখে দেখে কাঁদছে!
আমি অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করছি, " তুমি এমন করছ কেন? মেয়েটা কাঁদছে তো!
সে হাউমাউ করে ওর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে!! আমি মেয়েকে কোলে নিতে নিতে বলি, " বাবারা কোনদিন মরেনা মা। বাবাদের জন্য কাঁদতে নেই। এতে বাবারাই বেশী কষ্ট পায়"।



তাসলিমা শাম্মী

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.