হিমু এবং জিন
হিমু এবং জিন
- কে তুমি?
- আমারে চিনেন নাই, ভাইজান? ওইযে আমার মাইয়ার পরীক্ষার সময় দেরি হইয়া যাইতেছিলো, পরে আপনে আপনের রিকশায় কইরা আমার মাইয়ারে পরীক্ষার হলে নামাইয়া দিয়া আইলেন।
.
আমি তাকে চিনতে পারলাম না। তবুও চিনে ফেলেছি এমন ভান করে বললাম,
- হ্যাঁ, হ্যাঁ। মনে পড়েছে। তোমার মেয়ের পরীক্ষা কেমন হয়েছিলো?
- আপনের দোয়ায় পাশ করছে ভাইজান। একটা অনুরোধ, এই গরীবের ঘরে একদিন চাইডা ডাইল ভাত খাইবেন।
- আচ্ছা, দেখা যাবে।
- না ভাইজান। আপনেরে ম্যালা জায়গায় খুঁজছি। পাইনাই। এবার পাইছি, আপনেরে না নিয়া যাইতাম না। আপনে আইজ রাইতে আমার বাইত খাইবেন। নাইলে মনে কষ্ট পামু।
.
আমি জবাব দেবার আগেই রাজবাড়ী থানার সেকেন্ড অফিসার এসে আমার কলার ধরে বলছে,
- শালা, আজ তোরে পাইছি। পলাইয়া কই যাবি?
- পালাবো কেন স্যার?
- বড় বড় কথা, না? গতবার তো তোর এম.পি বাপের জন্য ছাড়া পাইছিলি। এবার কে ছাড়াইবো তোরে? সে তো এখন বিদেশ গেছে। শালা, পুলিশের সাথে ইয়ার্কি, না? এবার চৌদ্দ শিকে ঢুকাইয়া ডিম থেরাপি দিলে ঠিক হয়ে যাবে। সব ভণ্ডামি দূর হবে।
- স্যার, নতুন কোনো ডিমের রেসিপি শিখছেন? আসলে ডিম ভাজা আর সেদ্ধ খেতে খেতে ডিমের রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। স্যার, ডিম যেহেতু খাওয়াবেন, একটু বেশি করে রান্না করবেন। আমার সাথে একজন অতিথী খাবে?
- মতলব কী তোর? এবার আবার কার পায়ে ধরার ধান্দা করতাছোস?
- কোনো মতলত নেই স্যার। আমার সাথে আমার জিনও খাবে।
- জিন? ইয়ার্কি করোস তুই? চল থানায় চল।
- হ্যাঁ স্যার জিন। মহিলা জিন। বয়স তেতাল্লিশ দিন। বাবা মা হারিয়ে গেছে আটলান্টিক মহাসাগরে যাওয়ার সময়। তখন থেকেই আমার সাথে আছে। বাচ্চা জিন, বুঝেনই তো। ঝাল বেশি খাইতে পারেনা। তরকারিতে ঝাল কম....
- চুপ শালা। চল থানায় চল। তোর জীন আর তোর একসাথে ভর্তা বানামু।
.
আমাকে জেলে ঢুকিয়ে রাখার সময় সেকেন্ড অফিসারকে একটু ভয় দেখাবার চেষ্টা করলাম। তাকে বললাম,
- স্যার, যেখানে বসবেন একটু সাবধানে বসবেন। আমাকে থানায় আটকে রেখেছেন, এটা হিতংঢ্যূ'র পছন্দ হয়নি।
- হিতংঢ্যূ কে?
- ওইযে স্যার, বললাম না? আমার জিন। বয়স তেতাল্লিশ দিন। বাবা মা...
- চুপ, একটাও কথা না।
.
আমাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো ঘন্টাখানেক পরেই। রাজবাড়ী থানার সেকেন্ড অফিসার, আফজাল হোসেন তার চেয়ারে বসতে গিয়ে চেয়ার ভেঙে মেঝেতে পড়ে গেছেন। মাজায় প্রচন্ড চোট পেয়েছে। সাথে ভয়ও। সে বিশ্বাস করেছ আমার কাছে জিন আছে।
এখন রাত মাত্র গারোটা বাজে। মেসে ফিরে যাবার তাড়া নেই। রাতে কী কী করবো, মনে মনে ভাবতে লাগলাম। রুপাকে কল দেওয়া যায়।তারপর শিশুপার্কে গিয়ে টানটান হয়ে গাছের সাথে কথা বলতে বলতে ঘুমানো যাবে। এতরাতে রুপাকে কল দেওয়ার কোনো মানে নেই। তবুও সুলতানের দোকানে গিয়ে কল দেওয়া যায়। যতরাতেই আমি যাইনা কেন, সে ঠিকই ঘুম ঘুম চোখে ফোন বাড়িয়ে দিয়ে চা বানাতে বসবে।
.
- হ্যালো রুপা, কেমন আছো?
- কে, হিমু? এতরাতে ফোন দিয়েছো কেন?
- একটা জরুরি বিষয়ে কল দিয়েছি। তোমার হেল্প প্রয়োজন।
- কী হেল্প?
- তুমি কি জানো জিনের বাচ্চা কি খায়?
- কি বললে, জিন? আজগুবি কথা কেন বলো?
- হ্যাঁ, আমি একটা জিন পেয়েছি। মহিলা জিন। বয়স তেতাল্লিশ দিন। বাবা মা হারিয়ে গেছে আটলান্টিক মহাসাগরে যাওয়ার সময়। তখন থেকেই আমার সাথে আছে। বেচারা কিচ্ছু খেতে পারছেনা। একদম শুকিয়ে গেছে। এখন বলো তো ওকে কী খাওয়াবো?
- হিমু, আমি ফোনটা রাখি। এতরাতে তোমার আজগুবি কথা শোনার ইচ্ছে নেই আমার। প্লিজ, বিরক্ত করোনা।
রুপা ফোন রেখে দিলো। আমার আর জিনের বাচ্চার খাবার সম্পর্কে জানা হলোনা। বাদলকে ফোন দেওয়া যায়। ওকে বললে ও যেভাবেই হোক জিনের বাচ্চার খাবার সম্পর্কে জেনে আমাকে জানাবে। কিন্তু ওকে এখন ফোন দেওয়া যাবেনা। সামনে ওর পরীক্ষা।
.
রুপার সাথে কথা বলে আমি সোজা হাটা দিলাম পার্কের দিকে। বেড়াডাঙা দুইয়ের মাঝ বরাবর হাঁটছি। হঠাৎই দেখা হলো জাবেদের সাথে। জাবেদ হলো এলাকার নামকরা গুন্ডা। সকল বয়সের মানুষই তাকে দেখে ভয় পায়। সবসময় কাছে একটা ধারালো ছুড়ি থাকে। আমাকে দেখেই বললো,
- হিমু ভাই,হিমু ভাই, কেমন আছেন? কতদিন পর দেখা! একদম শুকিয়ে গেছেন।
- জাবেদ, জিন কি খায় জানো?
- কী কইলেন ভাই? জিন? জিন কী খায় আমি ক্যামনে জানমু ভাই? আমি তো পীর ফকির না, যে জিন পুষি।
- আসলে আমার কাছে একটা জিন আছে। মহিলা জিন। বয়স তেতাল্লিশ দিন। বাবা মা হারিয়ে গেছে আটলান্টিক মহাসাগরে যাওয়ার সময়। তখন থেকেই আমার সাথে আছে। এখন পড়েছি মহা বিপাকে। বাচ্চা জিন, কিছুই খেতে পারেনা। কী করি বলোতো!
- ভাই, আমারে দুইদিন সময় দেন। এর মধ্যেই আমি জিনের খাবার সম্পর্কে সবকিছু আপনেরে ডিটেইলস বইল্লা দিমু। আপনে চিন্তা নিয়েন না। জাস্ট দুইদিন। অনলি দুইদিন।
জাবেদের সাথে কথা বলার কোনো মানে নেই। সারারাত বকবক করেই যাবে। ওর কাছ থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে সিগারেট ধরিয়ে টানা শুরু করলাম। লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে যাচ্ছি পার্কের দিকে।
.
হঠাৎই মন ঘুরে গেলো। পার্কে গিয়ে রাতটা নষ্ট করার কোনো মানে নেই। তারচেয়ে বরং একটু মজা করা যাক। আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি 'খন্দকার এন্ড সন্স' দোকানের মালিকের বাসার সামনে। তার বাসায় গিয়ে নক করলাম। খন্দকার সাহেব বেরিয়ে এলেন। ঘুম ঘুম চোখে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। তাকে দেখেই গাল বরাবর কষিয়ে থাপ্পড় দিলাম। সে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়েই রইলো। একবার শুধু বললো,
- আমাকে মারলেন কেন?
- শালা, ঘরে বউ রেখে বাইরে ফষ্টিনষ্টি করিস। আজ তোর বউকে সব বলে দিবো।
খন্দকার সাহেব ভেবে পেলেন না কি বলবেন। মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন,
- কত চাই?
- তোর সব সম্পত্তি এতিমখানার নামে লিখে দিবি। পারবিনা? নাহলে আমার পোষা জিন দিয়ে তোর ষষ্টি পূজা করে দিবো।
- আপনার কী চাই সেটা বলুন। এগুলো দিয়ে দিলে ঘর সংসার চলবে কিভাবে?
- যা বলছি, তাই করবি। আমি রোজ আমার জিন মারফতে খবর নিবো। সময় তিনদিন। এর ভিতরে সবকিছু এতিমখানার নামে লিখে দেওয়া চাই, সবকিছু।
.
আকাশে আজ ভালো জোৎস্না উঠেছে। জন্ডিসের রোগীর হাতের মতো দেখাচ্ছে চারপাশ। আমি আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। এই হাঁটা চলবে অনন্তকাল। হিমুদের বিশ্রাম নিতে নেই।
.
সৌরভ হাসান

কোন মন্তব্য নেই