অন্যরকম খুন

অন্যরকম খুন
Image result for অন্যরকম খুন

সত্যি বলছি ইন্সপেক্টর সাহেব,তেরোবার কলিংবেল দেওয়ার পর যখন দরজা খুলেনি,তখন আমি দরজা
ভেঙ্গেছি।আমি রিতুকে মারিনি।" বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পরলো শিহাব।
নিজের স্ত্রীর খুনের ভার যখন নিজের উপর পরে,তখন তো কারোও স্বাভাবিক থাকার কথা না।শিহাবের অবস্থাটাও এইরকমই হয়েছে।পুলিশের কঠিন জিজ্ঞাসাবাদে অসহায় বোধ করছে।
পাঁচ বছরের সংসার ছিলো তাদের। দিনটা সোমবার ছিল।কাজের মেয়ে মিনা সকালে এসে দেখে ড্রয়িংরুমে রিতুর লাশ পরে আছে।কাছেই বসে ছিলো শিহাব।মিনা এমন চিৎকার করলো যে পুরো বিল্ডিং এর মানুষের ঘুম ভেংগে গেলো।ভীরের মধ্য থেকে কেও একজন পুলিশ ডাকলো।
লাশের বাহ্যিক অবস্থা দেখে যা বুঝা গেলো, বুকে গুলি করা হয়েছে।সাইলেন্সার লাগানো ছিল,তাই কেউ শোনতে পায়নি।আর অবাক করা বিষয় হলো রিভলভারের মডেল ডেজার্ট ঈগল। ভাবতে পারেন অবাক কেন বললাম।কারন একি মডেল এর বন্দুক শিহাবের বাবার নামে রেজিস্ট্রেশন করা।আর এই বন্দুকের মালিক এখন শিহাব।তাই লাশ উদ্ধারের পরেরদিনই শিহাবকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ।প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে বারবার অস্বীকার করলো।আর এদিকে শিহাবের নামে মামলা বসিয়ে দেয় রিতুর পরিবার।কারন শিহাব আর রিতুর মাঝে কিছুই ঠিক ছিলো না।ঝগড়া যেন প্রতিদিনের কাজ।এইকারনে কয়েকবার প্রতিবেশীরা কেয়ারটেকারকে নালিশ করেন।তারমধ্যে আবার কয়েকবার শিহাব রিতুকে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়।কিন্তু রাগ থাকলেও রিতুর জন্য সামান্য ভালোবাসাও মনের এক কোণে কাজ করতো শিহাবের।তাই বারবার রিতু ডিভোর্স চাইলেও দেয়নি শিহাব।পুলিশের কাছে সবকিছুই একরকম সহজ ছিলো। দেখে মনে হচ্ছিলো এইটা আর দশটা খুনের মতোই।ইন্সপেক্টর সাহেব মনে মনে ধরে নিয়েছিলেন এই কেইস সলভড। কিন্তু বাইরে থেকে এতো সাধারণ হলেও রিতু মার্ডার কেইসে আরও অনেক কিছুই বাকী ছিল।
পুলিশ শিহাবকে সরাসরি দোষতে পারছিলনা কারণ খুনের সময় সে আসলেই বাসায় ছিলো না।তাই বলে যে ভাড়াটে খুনি আনা অবাস্তব কিছু তা তো নয়।তাই এবার নজর দিতে হলো শিহাবের কল রেকর্ডের দিকে।সন্দেহজনক একাটা নাম্বার টারগেট করলেন ইন্সপেক্টরসাহেব।এবং তিনি ভুল দিকে পা বারান নি।নাম্বারটা একজন পেশাদার খুনির।নাম তার আলম।ঢাকার প্রায় প্রতিটি থানায়ই তার নাম এ মামলা রয়েছে।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো শিহাব আবারও অস্বীকার করছে।ইন্সপেক্টর সাহেব এবার খুব রেগে যান।
- ফোন তোর,নাম্বার তোর, বন্দুক ও তোর।তাও তুই কেমনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করিস?
- আমি সত্যি বলছি আমি কাউকে ফোন করিনি।আমি রিতুকে অনেক ভালোবাসতাম।
- অনেক দেখেছি তোর মতো। এই মোতালিব,যতক্ষন না স্বীকার করে, থামবি না।চামড়া তুলে ফেল মারতে মারতে।
কিন্তু এত মার খাওয়ার পরও শিহাব দোষ স্বীকার
করলো না।তাই এবার তাদের আলমের দিকে নজর দিতে হলো।কারণ আলম যদি দোষ মেনে নেয় তাহলেই শিহাবকে যথাযথ ভাবে অভিযোগ দেওয়া যাবে।কিন্তু মাসের পর মাস কেঁটে গেলো। আলমের কোনো খবর পাওয়া গেলোনা।এদিকে শিহাব জেলের ভেতর পরে আছে।সে যে সম্পুর্ণ নির্দোষ তেমন নয়।আর এ কথা সেও ভালো করেই জানে।তার কাছে বিয়েটা ছিলো শুধুই একটা সম্পর্ক,শারীরিক সম্পর্ক যাকে বলে।সারাদিন যেমনতেমন ব্যাবহার করলেও রিতুর দরকার পরতো রাতে।আর এইরকম সংসার রিতুর একবারেই পছন্দ ছিলোনা।সে প্রতিবাদ করতে জানতো।যাকে প্রতিবেশীরা ঝগড়াটে বলে চিনতো,সে আসলে নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করছিলো।অবশেষে ডিভোর্স চাইলেও শিহাব দিতে চায়নি।পারিবারিকভাবে মিমাংসা হয়।কিন্তু তাতেও শিহাবের মাঝে কোনও পরিবর্তন আসে নি।এক-দুই সপ্তাহ ঠিকমতো চললেও পরে সবকিছুই আগেরমতো হয়ে যায়। রিতুর বাবা অসুস্থ থাকায় সে বাপের বাড়ির বোঝা হতে চায়নি।তাই সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু সহ্য করতে করতে একসময় অবসাদ কাজ করতে থাকে রিতুর মনে।কয়েকবার চিন্তা করেছিল আত্মহত্যা করবে।কিন্তু সে শিহাবকে শাস্তি না দিয়ে চলে যেতে চায়নি।অপেক্ষায় ছিলো সঠিক সময়ের।কিন্তু তার আগেই তার জীবন থেমে গেছে।
শিহাব জেলের ভেতর প্রতিদিন মরছে।কোনও এক অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করেছে তার ভেতর।কিন্তু লোহার বারের পেছনের ছোট্ট ঘরটায় তার কথা শোনার মতো কেউ নেই।অবশেষে দেড় বছর পর আলম পুলিশের হাতে আসলো।এবং রিমান্ডে সে তার দোষ মেনে নিল।সেই রিতুর খুন করেছে এবং তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শিহাবের নাম্বার থেকেই।পুলিশ জবানবন্দিতে তার ভাষ্য ছিলো এইরকম," আমাকে ফোন করা হয় এবং বলা হয় এই কাজ করতে হবে।আমাকে অনেক বড় অংকের টাকা দেওয়া হয়েছে।" কিন্তু যখন আলমের সামনে শিহাবকে আনা হলো সে সবাইকে আশ্চর্য করে ফেলল।তার মতে তাকে ঠিকা দিয়েছে এক মহিলা।আর সে কখনও শিহাবের সাথে কথা বলেনি।কথাটা শোনামাত্র ইন্সপেক্টর সাহেব হকচকিয়ে গেলেন।তাই কল রেকর্ডগুলো শোনতে হলো তার।এক সপ্তাহপর তিনি সিডিটা হাতে পেলেন।এবং শিহাব ও আলমকে সামনে রেখেই শোনতে লাগলেন।
-হ্যালো, আমি আলমের সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
- কে আপনি? আমার নাম্বার কই পেলেন?
- আমার একটা কাজ করতে হবে।
- ফুল জব? আমি ছোট কাজ করি না।
- একজনকে মারতে হবে।
- ১ লক্ষ টাকা।
- আচ্ছা ঠিক আছে।
- কবে করতে হবে?
- এই রবিবার।আমি আপনাকে তথ্য ম্যাসেজ করে দিব।
- ঠিক আছে কাজ হয়ে যাবে।
- তবে আপনাকে আমার দেওয়া বন্দুক দিয়ে কাজ করতে হবে।
- তা কেনো?
- অই বন্দুকের মালিকের অনেক কিছু পাওনা আছে তাই।
- ঠিক আছে।এখন রাখি।
- আচ্ছা ভাই একটা রিকুয়েস্ট রাখবেন? মারার সময় বেশি কস্ট দিবেন না প্লিজ। এক গুলিতেই মারবেন।
- আপনে দেখি আজব কিসমের মানুষ। আমার কাজ আমি যেমন ইচ্ছা তেমন করে করবো।
- না ভাই প্লিজ।যে মহিলাকে মারবেন সেই ঘরের দরজা খুলবে।এক গুলিতে মেরে ফেলবেন প্লিজ।
- আচ্ছা ঠিক আছে।
ইন্সপেক্টরসাহেব প্রশ্ন করার জন্য শিহাবের দিকে তাকালেন।কিন্তু তার চোখ থেকে অঝোরে পানি পরছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই শিহাব বলে উঠলো,"তার মানে এইকারনে রিতু আমার কাছ থেকে ফোন চেয়ে নিতো?"
ঐ কথাটাই ছিল শিহাবের মুখ থেকে বের হয়া শেষ কথা।কারন তার পরেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। আর আজ অবদি সে কোমায় রেয়েছে।

Ruhan Ahmed

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.