অপরাহ্ন

অপরাহ্ন
Related image




সময় রাত ১১ টা। মিতালি বেগম ঘরের বাইরে বসে আছেন। শেষ বয়সে এসে কঁপালে এতো সুখ আছে মিতালি বেগম দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। স্বামী মারা গেছেন বছর পাঁচেক আগে। তিন ছেলের বিয়ে সম্পন্ন করেই পিতা তার দায়িত্ব পালন করে পরপারে চলে গেছেন। মিতালি বেগম যেতে পারেন নি। ছেলেদের মায়ার টানে। কলিজ্বার টুকরা ছেলেদের জন্ম থেকে আগলে রেখে মানুষ করেছেন। একজন নারীর সর্বোচ্চ সুখ মা ডাক শুনতে পারা। হয়তোবা সেই সুখের অঘোরেই স্বামীর মৃত্যুর শোক কিছুটা উবে গেছে।
.
ছোট ছেলে বউ নিয়ে বিদেশ চলে গেছে দুই বছর হল। বিদেশি নাগরিকত্ব পেয়েছেন। ওখানে সময়ের দাম অনেক। মায়ের কথা মনে করার সময় নেই তার। মায়ের খোঁজ নিলে তো মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যাবে। ছোট ছেলের জন্মের সময় মিতালি বেগম গর্ভপাত হবার আশংঙ্কা করে ডাক্তার মিতালি বেগমকে বলেছিলো দু'জনের একজনকে বাঁচানো যাবে। আপনার স্বামী আপনার প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছেন। মিতালি বেগম তখন হাউমাউ করে কেঁদে ডাক্তার কে বলেছিলো, দীর্ঘ সারে নয় মাস ত্যাগ স্বীকার করেছি, আমি আমার সন্তানকে দুনিয়াতে আনতে চাই। ডাক্তার মায়ের কান্না ফেলতে পারেননি, অপারেশন শেষে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া গেলো। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে মিতালি বেগম দীর্ঘ চার মাস আইসিউতে থাকার পর ধীরেধীরে সুস্থ হয়েছিলেন। আজ সেই সন্তান মা'কে ফেলে হাজার মাইল দূরে আপন সুখের সংসার নিয়ে ব্যস্ত।
.
বড় ছেলের বিয়ের পর বউ বেশিদিন থাকেনি। অনৈতিক নারী মেলামেশার কারনে বউ বেশিদিন সংসার করতে পারেনি। ডাক্তারি রিপোর্টে অক্ষমতা প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার কারনে বছর খানেক বাদেই বউ তালাকনামা দিয়ে চলে যায় বাপের বাড়ি। এরপর থেকে বড় ছেলে কোন কাজ কর্ম করেনা। বউ চলে যাবারা পর, নেশা ও নর্তকি তার নিত্য দিনের সঙ্গি। সারাদিন মদের বারে পরে থাকে। বৃদ্ধা মায়ের দেখাশোনার পরিবর্তে কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ শুনতে হয় বড় ছেলের মুখ থেকে। মাতাল ছেলের থেকে এর চাইতে ভালো কি আশা করা যেতে পারে! বড় ছেলের যখন দুই বছর বয়স তখন রোড এক্সিডেন্টে পা ভেঙে যাবার পর মিতালি বেগম দীর্ঘ ছয় মাস ঠিকমত একগ্লাস পানিও মুখে দেন নি। দিন রাত চব্বিশঘন্টা পাগলীনীর মত ছেলের সেবা করেছিলেন।
.
মেঝ ছেলে তার সংসার নিয়ে বেশ সুখেই আছে। মেঝ ছেলে দীর্ঘদিন তার সংসারেই মা'কে রেখেছে। পিতার রেখে যাওয়া চারতলা বাড়ির তৃতীয়তলায় মেঝ ছেলের সংসার। কথা ছিলো দ্বিতীয় তলায় ছোট ছেলে থাকবে, তৃতীয় তলায় থাকবে মেঝ ছেলে, চতুর্থ তলায় থাকবে বড় ছেলে এবং নিচ তলায় থাকবে মিতালি বেগম। রাতে কর্মক্ষেত্র থেকে সব ছেলে ঘরে ফিরে মায়ের সাথে দেখা করবে, এমনটাই কথা ছিলো। ছোট ছেলে দ্বিতীয় তলা ভাড়া দিয়ে বিদেশে পারি জমিয়েছে। অনলাইন ব্যাংকিং এর মাধ্যমে বিদেশে থেকেই মাস শেষে ঘর ভাড়া বুঝে নেন তিনি। বড় ছেলে চতুর্থতলায় একাই থাকে, মাঝে মাঝে নর্তকি এনে ফুর্তি করে।
.
মেঝ ছেলের বিয়ের পর বউ খুব আদর যত্ন করতো শাশুড়ির। মেঝ বউ বেশ বুদ্ধিমতিও বটে। বুদ্ধি করে শাশুড়িকে বুঝিয়ে নিজের সংসারে নিয়ে আসে। নিচতলা ভাড়া দিয়ে ভাড়ার অর্থ নিজের কুক্ষিগত করে। প্রথম দিকে খুব আদর যত্ন করতো শাশুড়ির। বৃদ্ধা মিতালি বেগম বার্ধক্যের কারনে বাথরুমে পরে গিয়ে চলা ফেরা ও কথাবলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে প্যারালাইসিস। তারপর থেকেই মেঝ বউ শাশুড়িকে সাংসারের বারতি ঝামেলা মনে করতো। মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলে ওঠে বুড়ি এখনও মরেনা কেন! বুড়ি হইছে তাও কৈ মাছের প্রাণ বুড়ির। মা'কে নিয়ে মেঝ ছেলের সংসারে তুমুল বাকবিতন্ডা লেগেই থাকে। মেঝ বউ কিছুতেই তার সংসারে শাশুড়িকে রাখবে না। মেঝ ছেলে বউকে বোঝায়, মা'কে তো আর একেবারে ফেলে দেয়া যায়না! যদি মা'কে সংসারে রাখতে না চাও তাহলে নিচ তলার ভাড়া তো আর খেতে পারবেনা। মেঝ বউ এই কথায় কিছুটা আস্বস্ত্য হলেও তার মাথায় অন্য বুদ্ধি আটে।
.
রাত সারে ১১ টা। মেঝ ছেলে ঘরে ফিরেছে। মাকে দরজার সামনে বসে থাকতে দেখেই প্রশ্ন করে, মা তুমি বাইরে কেনো? মিতালি বেগম কথা বলতে পারেনা। চোখের কোন গড়িয়ে জল পড়ছে। মেঝ বউ শাশুড়িকে টেনে হিচরে ঘরের বাইরে রেখে গেছে। মেঝ ছেলে ঘরে ঢুকেই বউকে রাগি স্বরে বলে তুমি মা'কে বাইরে রেখেছ কেনো? বউ ঝাঝালো চিৎকারে বলে ওঠে, স্বাদে কি আর বাইরে রেখে এসেছি নাকি? তুমি জানো সে আজকে কি করছে? বিছনায় পায়খানা করে সারা ঘর তলিয়েছে। ঘন্ধে তো ঘরে থাকাই দায় হয়ে পরেছিলো। নাক বেধে ২ ঘন্টা ধরে ঘর পরিষ্কার করেছি। তুমিতো সারাদিন বাইরে থাকো তুমি কি বুঝবে? তাছাড়া তোমার সন্তানেরা বড় হচ্ছে! এরকম পরিবেশে বড় হলে ওরা কি শিখবে শুনি? বউয়ের অভিযোগ শুনে মেঝ ছেলে চুপ হয়ে যায়।
.
খাবার টেবিলে বসে মেঝ ছেলে বউকে বলে, আর কয়েকটা দিন কষ্ট করো। এখন মা'কে রাখবো কোথায়? নিচতলা তো খালি করতে হবে নাকি? মেঝ বউ দাত চিবিয়ে বলে ওঠে ইসস নিচ তলা খালি করবো কেনো? চাইলেই কি যখন তখন ভাড়াটিয়া নামিয়ে দেয়া যায় নাকি? তাছাড়া মাসে মাসে যে হাজার হাজার টাকার ওষুধ খরচ লাগে সেই টাকা কে দিবে শুনি? মেঝ ছেলে মিন মিন করে বউকে বলে, মা মরে গেলেই সবকিছু তুমি পাবে। বউয়ের এক কথা, তোমার মা যদি এই সংসারে থাকে তাহলে আমি তোমার সংসার করবোনা।
.
ঘরের বাইরে থেকেই ছেলে ও বউয়ের কথা শুনছেন মিতালি বেগম। তিনি পারছেন না এখনই মরে যেতে। সৃষ্টিকর্তা তাকে কেনো এখনই মৃত্যু দান করছেন না! মেঝ ছেলের যখন ৪ বছর বয়স, তখন গরম ডাল পরে ছেলের হাত পুরে গিয়েছিলো। ডাক্তার বলেছিলো, এই হাতে কখনও শক্তি পাবেনা, মাংসের সাথে ভিতরের হাড় ও গলে নরম হয়ে গিয়েছিলো। ডাক্তারের কথা উপেক্ষা করে মিতালি বেগম দিনের পর দিন ছেলের সেবা করতে থাকেন ও সৃষ্টিকর্তার কাছে কান্নাকাটি করে ছেলেকে সুস্থ করে তুলতে সক্ষম হন। সেই ছেলে বড় হয়েছে, সংসার করছে, মা এখন সংসারের বোঝা, তাই মায়ের মৃত্যু কামনা করছে মিতালি বেগমের কলিজ্বার টুকরা ছেলে।
.
মেঝ ছেলে কার্যত অকার্যকর ভূমিকা পালন করে। শশুর ফোন করে বলে দিয়েছে, তুমি যদি তোমার মাকে সংসারে রাখো তাহলে আমার মেয়ে আমার বাড়ি চলে আসবে। এখন তুমি কি করবে সেটা তোমার বিষয়। পুরুষ মানুষ নাকি বউ ছাড়া থাকতে পারেনা, তাই সে তার মা'কে নিজের সংসারে রাখতে পারবেনা। বৃদ্ধাশ্রমেও দিতে পারবেনা, সেখানে দিতে গেলেও তো বাড়তি খরচ আছে। মেঝ বউ কিছুতেই বাড়তি খরচ সংসার থেকে দিবেনা।
.
মা সারারাত ঘরের বাইরে পরে থাকলেন। মেঝ ছেলে মা'কে ঘরে নিলো না। ভোরে বড় ছেলে বাড়ি ফেরে। মা'কে ঘরের বইরে পরে থাকতে দেখে কিছুটা মায়া হয় তার। সহানুভূতি থেকে মা'কে তার ঘরে জায়গা দেয়। অন্ধকার ঘরে মিতালি বেগম পরে থাকেন, চোখের জ্বলও শুকিয়ে গেছে। এই পৃথিবীতে তিনি এখন শুধুমাত্র সাংসারিক বোঝা ছাড়া আর কিছু নন। তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন সৃষ্টিকর্তা তাকে কেনো এখনও মৃত্যু দিচ্ছেন না!?!

Shahriyar Solayman

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.