কিডনী বিক্রেতা
কিডনী বিক্রেতা
১.
মহিলাটির তলপেট অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা করলেন জামাল সাহেব। কিছু ক্ষতের চিহ্ন। মহিলাটি অজ্ঞান। রুমে তিনি একা। তার মাথার উপর একটি হলুদ লাইট জ্বলছে। তিনি ব্লেড নিলেন একটি। তার পেটের ডান দিক বরাবর একটু নিচের দিকে পোচ দিলেন ব্লেড দিয়ে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হলো। এবার আরো একটু ধারালো একটা ছুরি দিয়ে পেটের সেই জায়গাটা আরো গভীর করে কেটে নিলেন। প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে। ভেতরে তিনি কিডনীটা দেখতে পেলেন। আশেপাশের শিরা-ধমনী কেটে নিলেন কিডনীটার। বের করে আনলেন সেটা। একইভাবে বাম পাশের কিডনীটাও বের করে নিলেন। এবার সেলাই করার পালা। সেলাই বলতে নামমাত্র সেলাই। এই মহিলা বাঁচবে না। তিনি হারুনকে ডাক দিলেন পাশের রুম থেকে। হারুন তার হেল্পার। শক্তপোক্ত ষন্ডামার্কা লোক। সে-ই নানা সময় বিভিন্ন লোকদের লোভ দেখিয়ে কিডনী বিক্রির কথা বলে তার কাছে নিয়ে আসে। মাঝে মাঝে কিডনাপ করেও আনে কিছু। অত্যন্ত কাজের লোক।
"হারুন, এই মহিলাকে কোথা থেকে এনেছো?"
"স্যার, কমলাপুর রেলস্টেশনে পাইসিলাম। হেতি নাকি রাত্রীর ট্রেইনে একা ঢাকা আইসে। বহুতক্ষণ পিছা করছি। পরে খালি জায়গা দেইখাই চাইপা ধরসি।"
"তারপর কি করেছো?"
"এই যে, আপনার এইহানে লইয়া আনসি"
"ইনার পেটে আর গায়ে নখের দাগ কেন?"
হারুন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। জামাল সাহেব ভালো করেই জানেন হারুন মহিলার সাথে কি করেছে। তবুও কিছু বললেন না। হারুন থতমত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। হারুনকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে জামাল সাহেব মাঝে মাঝে খুব মজা পান। তার জন্য অবশ্য ভালোই হয়েছে। এখন ব্যাপারটাকে রেপ কেস বলে চালিয়ে দেয়া হবে। কিডনি চুরির ব্যাপারটা ঢাকা পড়বে। এই দেশের মানুষ কোনো অজানা কারণে ধর্ষণ জিনিসটা নিয়ে খুব আগ্রহ বোধ করে। সাধারণ জনগণ ও খুব আগ্রহ নিয়ে পেপারে ধর্ষণের খবর পড়ে। দেশের এতো অন্যায়, অনাচার! কিন্তু এই দেশের মানুষ পেপারই কিনে কেবল ধর্ষনের খবর পড়ার জন্য। আজব জাতি। অতি আজব।তিনি হারুনকে লাশ ফেলে দেয়ার কথা বলে ক্লিনিক থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠলেন। সনামধন্য এক হাসপাতালের ডাক্তার তিনি। পাশাপাশি গোপনে এই কিডনী ব্যবসার কাজও করছেন গত ২ বছর ধরে।
২.
বাসায় পৌঁছে জামাল সাহেব দেখলেন তার বাবা গ্রাম থেকে এসে বসে আছে। কেন জানি মানুষটাকে তিনি দেখতে পারেন না। ইনার মুখে কেবল অভাবের কথা। লোকটি প্রচুর কথা বলে। যারা বেশি কথা বলে, তার সহ্য করতে পারেন না জামাল সাহেব। জামালকে দেখেই তিনি বললেন, "বাবা, ভালো আছিস?" জামাল উত্তর দিলেন, "হুম।"
"তোর মায়ের অসুখটা কেন জানি বাড়তাসে বা'জান। সারাদিন মুখে তর কথা।"
জামাল সাহেব মনে মনে বললেন, "এই যে... আবার শুরু।"
তার বাবা আবার বললেন, "বহুত দিন ধইরা তোর মারে দেখস নাই। এইবার একটু চল না।"
"বাবা, এই নাও। এই নোটটা রাখো।" বলে জামাল তার বাবার হাতে একটা ৫০০ টাকার নোট গুঁজে দিলেন।
"আমি তো তোর কাছে টাকা চাই নাই। শুধু চাইসি তোর মারে একবার দেইখা আয়।"
"আমি খুব ব্যস্ত বাবা এখন। আগামী মাসে যাব।"
"তোর ছোট বইনটারও বিয়ার বয়স হইতাসে। আমরা দুইজন বুড়া মানুষ। আর কত সাম্লাইবার পারি?"
"আমি পরে কথা বলবো বাবা। আমি এখন ক্লান্ত।"
তার বাবা মোজাম্মেল সাহেব একজন রিকশা চালক। গ্রামে রিকশা চালান। কষ্টের টাকায় তাকে মেডিকেল এ পড়িয়েছেন। তার ছেলে আজ অনেক বড় মানুষ। নামকরা ডাক্তার। প্রচুর টাকা। কিন্তু তার ব্যবহারে খুব কষ্ট পান। তবু বারবার আসেন স্ত্রীর জোরাজোরিতে। ছেলেটাকে যে বড্ড ভালোবাসেন মহিলা। মোজাম্মেল সাহেবেরও কোনো উপায় নেই। বয়স হচ্ছে। গায়ে আর জোর পান না। তার স্ত্রী অসুস্থ। ছোট মেয়েটাকেও বিয়ে দেয়া দরকার। তার ও হাঁপানির সমস্যা। কিন্তু ছেলের বাড়িতে আসলে শান্তি শান্তি লাগে। অনেক উন্নতি করেছে তার ছেলেটা।
জামাল সাহেব শুয়ে পড়েন। তার স্ত্রী শাহিদা পাশে এসে বসে তার। জিজ্ঞাসা করে,"তোমার বাবা কেন এসেছেন?"
"ওই যে, প্রতিবার যে জন্য আসেন। ভাল্লাগে না আর।"
"আচ্ছা শুনো, এই শুক্রবার আমি বাপের বাড়ি যাব। আমার বাবা অস্ট্রেলিয়া থেকে আসছেন আগামী বৃহঃপতিবার।" জামাল সাহেবের শ্বশুড় ওয়ার্ল্ড ট্যুরে বেরিয়েছেন। প্রতি বছর একটি করে মহাদেশ ঘুরেন।
জামাল সাহেবের স্ত্রী বললেন, "বাবার জন্য কিছু শপিং করা দরকার। তিনি এন্টিক জিনিস সংগ্রহ করতে খুব পছন্দ করেন।আমাকে কিছু টাকা দিও।"
"কত লাগবে?"
"একটা নেপালী কুকরি পছন্দ করেছি। বাবার খুব ভালো লাগবে।১২০০০ টাকা দাও।"
জামাল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন "ড্রয়ারে ক্যাশ আছে। নিয়ে নিও।"
সকালে উঠে জামাল শুনলেন, তার বাবা ঘুম থেকে উঠেই কাউকে না জানিয়ে চলে গেছেন।
৬ মাস পর....
জামাল সাহেব ক্লিনিকে বসে আছেন। এমন সময় তার স্ত্রীর ফোন। জামাল সাহেবের বাবা নাকি আজ সকালেও বাড়িতে এসেছেন। জামাল সাহেব তার বাবাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। বেশি পাত্তা দিতে গেলে অনেক টাকা চেয়ে বসবেন আবার। গরীব মানুষদের এই একটাই সমস্যা। ডিজগাস্টিং!
"হারুন, এই মহিলাকে কোথা থেকে এনেছো?"
"স্যার, কমলাপুর রেলস্টেশনে পাইসিলাম। হেতি নাকি রাত্রীর ট্রেইনে একা ঢাকা আইসে। বহুতক্ষণ পিছা করছি। পরে খালি জায়গা দেইখাই চাইপা ধরসি।"
"তারপর কি করেছো?"
"এই যে, আপনার এইহানে লইয়া আনসি"
"ইনার পেটে আর গায়ে নখের দাগ কেন?"
হারুন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। জামাল সাহেব ভালো করেই জানেন হারুন মহিলার সাথে কি করেছে। তবুও কিছু বললেন না। হারুন থতমত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। হারুনকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে জামাল সাহেব মাঝে মাঝে খুব মজা পান। তার জন্য অবশ্য ভালোই হয়েছে। এখন ব্যাপারটাকে রেপ কেস বলে চালিয়ে দেয়া হবে। কিডনি চুরির ব্যাপারটা ঢাকা পড়বে। এই দেশের মানুষ কোনো অজানা কারণে ধর্ষণ জিনিসটা নিয়ে খুব আগ্রহ বোধ করে। সাধারণ জনগণ ও খুব আগ্রহ নিয়ে পেপারে ধর্ষণের খবর পড়ে। দেশের এতো অন্যায়, অনাচার! কিন্তু এই দেশের মানুষ পেপারই কিনে কেবল ধর্ষনের খবর পড়ার জন্য। আজব জাতি। অতি আজব।তিনি হারুনকে লাশ ফেলে দেয়ার কথা বলে ক্লিনিক থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠলেন। সনামধন্য এক হাসপাতালের ডাক্তার তিনি। পাশাপাশি গোপনে এই কিডনী ব্যবসার কাজও করছেন গত ২ বছর ধরে।
২.
বাসায় পৌঁছে জামাল সাহেব দেখলেন তার বাবা গ্রাম থেকে এসে বসে আছে। কেন জানি মানুষটাকে তিনি দেখতে পারেন না। ইনার মুখে কেবল অভাবের কথা। লোকটি প্রচুর কথা বলে। যারা বেশি কথা বলে, তার সহ্য করতে পারেন না জামাল সাহেব। জামালকে দেখেই তিনি বললেন, "বাবা, ভালো আছিস?" জামাল উত্তর দিলেন, "হুম।"
"তোর মায়ের অসুখটা কেন জানি বাড়তাসে বা'জান। সারাদিন মুখে তর কথা।"
জামাল সাহেব মনে মনে বললেন, "এই যে... আবার শুরু।"
তার বাবা আবার বললেন, "বহুত দিন ধইরা তোর মারে দেখস নাই। এইবার একটু চল না।"
"বাবা, এই নাও। এই নোটটা রাখো।" বলে জামাল তার বাবার হাতে একটা ৫০০ টাকার নোট গুঁজে দিলেন।
"আমি তো তোর কাছে টাকা চাই নাই। শুধু চাইসি তোর মারে একবার দেইখা আয়।"
"আমি খুব ব্যস্ত বাবা এখন। আগামী মাসে যাব।"
"তোর ছোট বইনটারও বিয়ার বয়স হইতাসে। আমরা দুইজন বুড়া মানুষ। আর কত সাম্লাইবার পারি?"
"আমি পরে কথা বলবো বাবা। আমি এখন ক্লান্ত।"
তার বাবা মোজাম্মেল সাহেব একজন রিকশা চালক। গ্রামে রিকশা চালান। কষ্টের টাকায় তাকে মেডিকেল এ পড়িয়েছেন। তার ছেলে আজ অনেক বড় মানুষ। নামকরা ডাক্তার। প্রচুর টাকা। কিন্তু তার ব্যবহারে খুব কষ্ট পান। তবু বারবার আসেন স্ত্রীর জোরাজোরিতে। ছেলেটাকে যে বড্ড ভালোবাসেন মহিলা। মোজাম্মেল সাহেবেরও কোনো উপায় নেই। বয়স হচ্ছে। গায়ে আর জোর পান না। তার স্ত্রী অসুস্থ। ছোট মেয়েটাকেও বিয়ে দেয়া দরকার। তার ও হাঁপানির সমস্যা। কিন্তু ছেলের বাড়িতে আসলে শান্তি শান্তি লাগে। অনেক উন্নতি করেছে তার ছেলেটা।
জামাল সাহেব শুয়ে পড়েন। তার স্ত্রী শাহিদা পাশে এসে বসে তার। জিজ্ঞাসা করে,"তোমার বাবা কেন এসেছেন?"
"ওই যে, প্রতিবার যে জন্য আসেন। ভাল্লাগে না আর।"
"আচ্ছা শুনো, এই শুক্রবার আমি বাপের বাড়ি যাব। আমার বাবা অস্ট্রেলিয়া থেকে আসছেন আগামী বৃহঃপতিবার।" জামাল সাহেবের শ্বশুড় ওয়ার্ল্ড ট্যুরে বেরিয়েছেন। প্রতি বছর একটি করে মহাদেশ ঘুরেন।
জামাল সাহেবের স্ত্রী বললেন, "বাবার জন্য কিছু শপিং করা দরকার। তিনি এন্টিক জিনিস সংগ্রহ করতে খুব পছন্দ করেন।আমাকে কিছু টাকা দিও।"
"কত লাগবে?"
"একটা নেপালী কুকরি পছন্দ করেছি। বাবার খুব ভালো লাগবে।১২০০০ টাকা দাও।"
জামাল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন "ড্রয়ারে ক্যাশ আছে। নিয়ে নিও।"
সকালে উঠে জামাল শুনলেন, তার বাবা ঘুম থেকে উঠেই কাউকে না জানিয়ে চলে গেছেন।
৬ মাস পর....
জামাল সাহেব ক্লিনিকে বসে আছেন। এমন সময় তার স্ত্রীর ফোন। জামাল সাহেবের বাবা নাকি আজ সকালেও বাড়িতে এসেছেন। জামাল সাহেব তার বাবাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। বেশি পাত্তা দিতে গেলে অনেক টাকা চেয়ে বসবেন আবার। গরীব মানুষদের এই একটাই সমস্যা। ডিজগাস্টিং!
হারুন গিয়েছে লোক আনতে। এক লোককে নাকি কিডনী বিক্রি করতে রাজি করাতে পেরেছে। লোকটির কিডনির দাম সম্পর্কে কোনো আইডিয়া নেই। এক একটা কিডনি যেখানে ৬-৭ লাখ টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে এই লোক তার কিডনি পঞ্চাশ হাজারে বিক্রি করতে রাজি হয়েছে। সিড়িতে পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। হারুন নিশ্চয়ই চলে এসেছে। তিনি মাস্ক পড়ে নিলেন। কাউকে চেহারা দেখান না তিনি। হারুন এলো। হারুন সাহেবের সাথে এক বুড়োও এলো। এই বুড়ো আর কেউ নন। জামাল সাহেবের বাবা! হারুন তাকে ধরে ধরে আনছে। উনাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল সে।
জামাল সাহেব চুপচাপ বসে আছেন একটা চেয়ারে। এখনো টু শব্দ করেন নি। মাথা নিচু করে বসে আছেন। ব্যাপারটা হজম করতে সময় লাগছে তার। তার বাবা কিডনি বিক্রি করতে এসেছে! কাকতালীয় ভাবে তার হাতেই এসে পড়লেন! তার বাবা এতোটাই অভাবে আছেন যে তাকে তার কিডনী বিক্রি করতে হবে?
হারুন ফিসফিস করে বললো, "ওস্তাদ, এই লোক বাস স্ট্যান্ডে বইসা কাঁদতেসিল। ইনার নাকি বহুত অভাব। অল্প কিছু টাকা দিলে হইব।"
মোজাম্মেল সাহেবও সুর মেলালেন। বললেন, "আব্বা, আমার পোলা ও তোমার মতো একজন ডাক্তার। তার নাম জামাল। চোখে আজকাল তেমন ভালো দেখি না। কিন্তু আমার পোলাটার গা-গতর তোমার মতো।"
হারুন মোজাম্মেল সাহেবকে তাড়া দিল। বললো, "যান, গেঞ্জিটা খুইলা বেড়ের উপর শুইয়া পড়েন।"
লোকটি যেতে যেতে আবার বললো, "ডাক্তার আব্বা,আমি টাকাডা আজের ভেতর পামু তো? আমার মাইয়াটার বিয়া দেওন লাগবো। মাইয়ার মা ও অসুস্থ। আমিও চউখে দেখি না আজকাল। টাকাডা খুব দরকার। আমার ডাক্তার পোলাডা যে খুব ব্যস্ত থাকে। অনেক দিন দেখি না তারে। টাকাডা পাইলে একবার তার বাসায় যামু তার জন্য মিষ্টি দই লইয়া। সে ছোট বেলায় মিষ্টি দই খাইতে খুউব পছন্দ করত..."
জামাল সাহেব তখনো মাথা নিচু করেই বসে আছেন। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে।
হারুন এসে জামালের কানে কানে বললো, "ওস্তাদ, এই বুড়া গাব্দাটা কিছুই বুঝবো না। এক কাম করি। দুইডা কিডনিই বাইর কইরা লইয়া বুডিগঙায় থুইয়া আসি। ডবল লাভ..."
তার কথা শেষ হতে না হতেই "ঠাস" করে একটা চড় এসে পড়লো হারুনের গালে।
৩.
মোজাম্মেল সাহেব এখন তার পুত্র জামালের বাসায় থাকেন। তার স্ত্রীও তার সাথে থাকেন। তার মেয়েটার বিয়ে দেয়া হয়েছে। বিয়ের সব খরচ জামাল নিজেই দিয়েছে। এখন সে যতক্ষণ বাসায় থাকে, তার বাবা মায়ের রুমে ঘুর ঘুর করতে থাকে। মোজাম্মেল সাহেব মাঝে মাঝে ছেলের আচরণ এর পরিবর্তনে অবাক হোন। সেদিন রাতে মাস্ক পরা লোকটি তাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে বেহুশ করেছিল। এর পর তার আর কিছু মনে নেই। তারপর যখন তিনি চোখ খুলেছেন, তখন থেকেই তিনি ছেলের বাসায়। জামাল বলেছে, মাস্ক পরা লোকটি নাকি জামালের বন্ধু ছিল। জামালের নাম শুনে জামালকে খবর দিয়েছিল। আর জামাল গিয়ে তাকে সেখান থেকে নিয়ে এসেছে। ছেলে তার মাকেও নিয়ে এসেছে। ধুমধাম করে নিজেই পাত্র দেখে বোনের বিয়ে দিয়েছে। ছেলের আচরণে বাবা খুব খুশি। তার স্ত্রী স্বামীর এই পরিবর্তন দেখে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করেন, "তোমার কি হয়েছে বলো তো?"
জামাল উত্তর দেন না। নারীজাতির এটাই সমস্যা। কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে নিতে চায় না। প্রকৃতি কখনোই চায় না যে নারীরা সন্দেহবিহীন জীবনযাপন করুক। "সন্দেহ" জিনিসটা প্রকৃতি সব নারীর মধ্যেই ঢুকিয়ে দিয়েছে নিজ হাতে।
জামাল সাহেব চুপচাপ বসে আছেন একটা চেয়ারে। এখনো টু শব্দ করেন নি। মাথা নিচু করে বসে আছেন। ব্যাপারটা হজম করতে সময় লাগছে তার। তার বাবা কিডনি বিক্রি করতে এসেছে! কাকতালীয় ভাবে তার হাতেই এসে পড়লেন! তার বাবা এতোটাই অভাবে আছেন যে তাকে তার কিডনী বিক্রি করতে হবে?
হারুন ফিসফিস করে বললো, "ওস্তাদ, এই লোক বাস স্ট্যান্ডে বইসা কাঁদতেসিল। ইনার নাকি বহুত অভাব। অল্প কিছু টাকা দিলে হইব।"
মোজাম্মেল সাহেবও সুর মেলালেন। বললেন, "আব্বা, আমার পোলা ও তোমার মতো একজন ডাক্তার। তার নাম জামাল। চোখে আজকাল তেমন ভালো দেখি না। কিন্তু আমার পোলাটার গা-গতর তোমার মতো।"
হারুন মোজাম্মেল সাহেবকে তাড়া দিল। বললো, "যান, গেঞ্জিটা খুইলা বেড়ের উপর শুইয়া পড়েন।"
লোকটি যেতে যেতে আবার বললো, "ডাক্তার আব্বা,আমি টাকাডা আজের ভেতর পামু তো? আমার মাইয়াটার বিয়া দেওন লাগবো। মাইয়ার মা ও অসুস্থ। আমিও চউখে দেখি না আজকাল। টাকাডা খুব দরকার। আমার ডাক্তার পোলাডা যে খুব ব্যস্ত থাকে। অনেক দিন দেখি না তারে। টাকাডা পাইলে একবার তার বাসায় যামু তার জন্য মিষ্টি দই লইয়া। সে ছোট বেলায় মিষ্টি দই খাইতে খুউব পছন্দ করত..."
জামাল সাহেব তখনো মাথা নিচু করেই বসে আছেন। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে।
হারুন এসে জামালের কানে কানে বললো, "ওস্তাদ, এই বুড়া গাব্দাটা কিছুই বুঝবো না। এক কাম করি। দুইডা কিডনিই বাইর কইরা লইয়া বুডিগঙায় থুইয়া আসি। ডবল লাভ..."
তার কথা শেষ হতে না হতেই "ঠাস" করে একটা চড় এসে পড়লো হারুনের গালে।
৩.
মোজাম্মেল সাহেব এখন তার পুত্র জামালের বাসায় থাকেন। তার স্ত্রীও তার সাথে থাকেন। তার মেয়েটার বিয়ে দেয়া হয়েছে। বিয়ের সব খরচ জামাল নিজেই দিয়েছে। এখন সে যতক্ষণ বাসায় থাকে, তার বাবা মায়ের রুমে ঘুর ঘুর করতে থাকে। মোজাম্মেল সাহেব মাঝে মাঝে ছেলের আচরণ এর পরিবর্তনে অবাক হোন। সেদিন রাতে মাস্ক পরা লোকটি তাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে বেহুশ করেছিল। এর পর তার আর কিছু মনে নেই। তারপর যখন তিনি চোখ খুলেছেন, তখন থেকেই তিনি ছেলের বাসায়। জামাল বলেছে, মাস্ক পরা লোকটি নাকি জামালের বন্ধু ছিল। জামালের নাম শুনে জামালকে খবর দিয়েছিল। আর জামাল গিয়ে তাকে সেখান থেকে নিয়ে এসেছে। ছেলে তার মাকেও নিয়ে এসেছে। ধুমধাম করে নিজেই পাত্র দেখে বোনের বিয়ে দিয়েছে। ছেলের আচরণে বাবা খুব খুশি। তার স্ত্রী স্বামীর এই পরিবর্তন দেখে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করেন, "তোমার কি হয়েছে বলো তো?"
জামাল উত্তর দেন না। নারীজাতির এটাই সমস্যা। কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে নিতে চায় না। প্রকৃতি কখনোই চায় না যে নারীরা সন্দেহবিহীন জীবনযাপন করুক। "সন্দেহ" জিনিসটা প্রকৃতি সব নারীর মধ্যেই ঢুকিয়ে দিয়েছে নিজ হাতে।

কোন মন্তব্য নেই