অভিনয়
অভিনয়
শিমুর রক্তভেজা অর্ধ-আবৃত দেহটার সামনে দ্বিতীয়বারের মতো গিয়ে দাঁড়াল ইমন। অভিনয় করা খুব সহজ নয়; বিশেষতঃ এমন সময়ে তো নয়ই। কিন্তু সে প্রাণপণ অভিনয় করে চলেছে যেন তার জীবন থেকে কত বড় কিছু হারিয়ে ফেলল। সঙ্গে শিমুর বাবা-মা, সাত-আটজন বন্ধুবান্ধব এবং পুলিশের তিনজন লোক। ইমন নিজে এখানে একা মেসে থাকে; তা না হলে এই জনমানুষের ভিড়ে তার বাবা মাও থাকতেন। শিমুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ভয়ংকরভাবে। কাজটা আজ সন্ধ্যায়ই ইমন করেছে এবং এখন পুনরায় লাশটা দেখে তার গা গোলাচ্ছে।
উত্তরা ৫ নং সেক্টরের লেকের ধারে ফুটপাতের পাশে পড়ে থাকা শিমুর লাশ। তার পোশাকের অবস্থা দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না তার সাথে কী করা হয়েছে। তারপর তার মুখে ব্লেড দিয়ে এলোমেলোভাবে এঁকে দেওয়া হয়েছে। পুরো কাজটি ইমন আর তার বন্ধু শাহরিয়ার মিলে করেছে শাহরিয়ারের মামার ফাঁকা ফ্ল্যাটে। ইমন কাজ সেরে চটপট মেসে গিয়ে ঘুমোনোর অভিনয় করে। তার কাছে ফোন আসতে দেরি হয় নি। তারপর আবার প্রিয়জনহারা মানুষের মতো হাহাকারের অভিনয়। তবে পুলিশের লোকের সামনে সত্যিই তার ভয় ভয় করছে। যদি তারা টের পেয়ে যায়?
দু'বছর আগের একটি বসন্তের দিন। পার্কের বেঞ্চটি কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়। অসংখ্য ফুলে রক্তিম হয়ে যাওয়া বেঞ্চটি থেকে ফুল ঝেড়ে বসল সে। মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর দেখল সবুজ শাড়ি পরিহীতা একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে। ইমনের বুঝতে অসুবিধা হলো না তার প্রেমিক জীবন দুয়ারে কড়া নাড়ছে।
"ইমন?"
"শিমু?"
তারপর দুজনই চুপচাপ। কথার বড্ড অভাব। এমন সময় কৃষ্ণচূড়ার একটি ফুল ইমনের মাথায় পড়লো কিন্তু সে টের পেল না। তাই দেখে শিমু হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরিয়ে ফেলল, যেন এমন মজার ব্যাপার সে আর দেখে নি। ইমন বোকা বোকা দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল, এমন একটি দৃশ্য তার মতো একটি গ্রাম্য ছেলের জীবনের মঞ্চে অভিনীত হবে তা কী সে কখনো কল্পনা করতে পেরেছিল?
"ইমন?"
"শিমু?"
তারপর দুজনই চুপচাপ। কথার বড্ড অভাব। এমন সময় কৃষ্ণচূড়ার একটি ফুল ইমনের মাথায় পড়লো কিন্তু সে টের পেল না। তাই দেখে শিমু হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরিয়ে ফেলল, যেন এমন মজার ব্যাপার সে আর দেখে নি। ইমন বোকা বোকা দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল, এমন একটি দৃশ্য তার মতো একটি গ্রাম্য ছেলের জীবনের মঞ্চে অভিনীত হবে তা কী সে কখনো কল্পনা করতে পেরেছিল?
ইমন ঢাকা এসেছিল তার ছ'মাস আগে। এখানে তিতুমীর কলেজে পড়ছে সে একটা মেসে থেকে। প্রথম প্রথম শহুরে জীবনে খাপ খাওয়াতে, বন্ধুবান্ধবীদের সাথে ভাব জমাতেই সময় ব্যয় হয়েছে। তারপর শুধু মজায় ছিল। গ্রামে বাবার ধানীজমির কারবারি, কালোসাদা মিলিয়ে অনেক টাকা। ইমন বাবাকে ফোন করে মিথ্যে বই কেনার কথা বলে টাকা আদায় করে তারপর সেটা ওড়াত। একসময় ফেসবুকের কল্যাণে টুকটাক আলাপচারিতার মাধ্যমে পরিচয় হলো শিমুর সঙ্গে। টুকটাক আলাপচারিতা একসময় সুদীর্ঘ কথোপকথনের রূপলাভ করতে শুরু করল।
শিমু তার সাথেই অন্য কলেজে পড়ত। দুজনের বাসাই ছিল উত্তরায়। মোটামুটি বড়লোক বাবার একমাত্র কন্যা হিসেবে তার আদরের কমতি ছিল না। তাদের দুজনার সম্পর্কের জল অনেকদূর গড়াবার পর শিমুর বাবা মাও মেনে নেন।
শিমু তার সাথেই অন্য কলেজে পড়ত। দুজনের বাসাই ছিল উত্তরায়। মোটামুটি বড়লোক বাবার একমাত্র কন্যা হিসেবে তার আদরের কমতি ছিল না। তাদের দুজনার সম্পর্কের জল অনেকদূর গড়াবার পর শিমুর বাবা মাও মেনে নেন।
ভালোবাসা খুবই অদ্ভুত। এটা একটা পবিত্র অনুভূতি হলেও খুব সহজেই একে কলুষিত করে ফেলা যায়। প্রায় একবছর পরস্পরকে সবটুকু দিয়ে ভালোবাসার পর সে জায়গায় অপবিত্র চাওয়াগুলি এসে ভিড় করতে শুরু করলো। ইমন শিমুকে নিয়ে অধিকাংশ সময়ই জল্পনা কল্পনায় মেতে থাকতে শুরু করলো তারপর সরাসরি প্রস্তাব করল ঘনিষ্ঠ হবার। কিন্তু শিমু বারবার কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার কারণে ইমন ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করতে ছাড়ল না। তাতেও কাজ না হওয়ায় সে জ্বালা মিটিয়ে খুনই করে ফেলল।
"ইমন! এমনটা কেন করলে?"
কাতরভাবে জিজ্ঞেস করেছিল শিমু।
"তোমার অহংকার গুঁড়ো করতে"
"কী অহংকার? আমি তো তোমা-
কথা শেষ করবার আগেই ছুরি বসিয়ে দিল শাহরিয়ার। পাশবিক চাওয়া কতটা প্রভাব ফেলতে পারে যে একজন মানুষ তার একসময়কার ভালোবাসার মানুষটিকে মেরে ফেলতে দ্বিধা করে না? শক্ত মনের কিছু কিছু মেয়ের পরিণতি হয়তো এমনই হয়।
"ইমন! এমনটা কেন করলে?"
কাতরভাবে জিজ্ঞেস করেছিল শিমু।
"তোমার অহংকার গুঁড়ো করতে"
"কী অহংকার? আমি তো তোমা-
কথা শেষ করবার আগেই ছুরি বসিয়ে দিল শাহরিয়ার। পাশবিক চাওয়া কতটা প্রভাব ফেলতে পারে যে একজন মানুষ তার একসময়কার ভালোবাসার মানুষটিকে মেরে ফেলতে দ্বিধা করে না? শক্ত মনের কিছু কিছু মেয়ের পরিণতি হয়তো এমনই হয়।
অধিকাংশ ধর্ষণ কেসের পুরোপুরি সমাধান হয় না। ইমনের কীর্তিও চাপা পড়ে গেল সময়ের প্রলেপে। ইমন শিমুহত্যার ট্র্যাজেডি ভুলতে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ফুর্তিতে মেতে গেল। কিন্তু অপরাধী কখনো ছাড়া পায় না। যথারীতি ঝকঝকে রোদেলা এক সকালে ভার্সিটি যাবার জন্য বের হওয়ার আগে দরজায় ঘা পড়ল।
"কে?"
"জ্বি পুলিশ"
"আপনারা?"
"আপনাকে একটু থানায় যেতে হবে"
"কিন্তু আমার অপরাধ?"
"সেটা গেলেই জানবেন। তবে আপনও স্বেচ্ছায় না গেলে আমরা বাধ্য হবো জোর করতে। সেটা সুখকর হবে না"
"কে?"
"জ্বি পুলিশ"
"আপনারা?"
"আপনাকে একটু থানায় যেতে হবে"
"কিন্তু আমার অপরাধ?"
"সেটা গেলেই জানবেন। তবে আপনও স্বেচ্ছায় না গেলে আমরা বাধ্য হবো জোর করতে। সেটা সুখকর হবে না"
ইমনের বন্ধু শাহরিয়ার বড়লোক বাবার ছোট ছেলে। রাজ্যের কুকাজ করে বেড়ায়। সপ্তাহ দুয়েক বাদে পুলিশের হাতে ধরা পড়ল মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে। বেশ শক্ত কেস, তাই অকাতরে টাকা ঢেলেও বাবা আহসানউদ্দিন ছেলেকে বাঁচাতে পারলেন না। রিমান্ডে নেবার পর সে সব অপরাধ স্বীকার করে ফাঁসিয়ে দিল ইমনকে। সপ্তাহদুয়েক আগে খুন হওয়া শিমুর লাশ পুনরায় তুলে ফরেনসিকে পাঠানো হলো। লাশ ডিকম্পোজড হওয়া শুরু করলেও সৌভাগ্যক্রমে তার দেহ থেকে ডিএনএ টেস্টের জন্য স্যাম্পল উদ্ধার করা গেল। তারপর শাহরিয়ার আর ইমনের ডিএনএ এর সঙ্গে ম্যাচ করে পুলিশ প্রমাণ পেল ধর্ষণের। তারপরের ঘটনা খুবই সাধাসিধে ও সংক্ষিপ্ত।
ইমন আর শাহরিয়ারকে একই সেলে রাখা হয় নি। হিসেবমতো আর ছয়দিন সে পৃথিবীতে থাকছে। গতকাল বিকেলে শিমুর বাবা এসেছিলেন।
"ইমন"
"জ্বি আংকেল?"
"কেমন আছো?"
"এই তো ভালোই"
"থাকো, তবে আমার যদি ক্ষমতা থাকত, আমি চেষ্টা করতাম তোমার মৃত্যু আরও যন্ত্রণাদায়ক করা যায় কি না।"
খুব শীতল কন্ঠে কথাগুলো বলে চলে গেলেন তিনি। আজ সন্ধ্যায় তার বাবা মায়ের দেখা করতে আসার কথা। মনে মনে মাকে কী কী বলবে সাজাতে লাগলো ইমন। কেউ ডাকল?
"ইমন?"
"কে?" আশপাশে কেউ নেই।
"আমি-আমি শিমু"
"কোথায় তুমি?"
"তোমার আশেপাশেই। তোমার মৃত্যুযন্ত্রণাটা উপভোগ করার জন্য খুব করে অপেক্ষা করছি।"
ইমন হন্যে হয়ে এদিক ওদিক তাকাল। কেউ নেই; কোথাও কেউ নেই।
"ইমন"
"জ্বি আংকেল?"
"কেমন আছো?"
"এই তো ভালোই"
"থাকো, তবে আমার যদি ক্ষমতা থাকত, আমি চেষ্টা করতাম তোমার মৃত্যু আরও যন্ত্রণাদায়ক করা যায় কি না।"
খুব শীতল কন্ঠে কথাগুলো বলে চলে গেলেন তিনি। আজ সন্ধ্যায় তার বাবা মায়ের দেখা করতে আসার কথা। মনে মনে মাকে কী কী বলবে সাজাতে লাগলো ইমন। কেউ ডাকল?
"ইমন?"
"কে?" আশপাশে কেউ নেই।
"আমি-আমি শিমু"
"কোথায় তুমি?"
"তোমার আশেপাশেই। তোমার মৃত্যুযন্ত্রণাটা উপভোগ করার জন্য খুব করে অপেক্ষা করছি।"
ইমন হন্যে হয়ে এদিক ওদিক তাকাল। কেউ নেই; কোথাও কেউ নেই।
Om Ar

কোন মন্তব্য নেই