রিশাদের দিনগুলো

রিশাদের দিনগুলো

'- এসবের জন্য তোকে খাওয়াই পড়াই? হ্যা? কী দাম রেখেছিস? মানুষের সামনে তোর জন্য মুখ দেখাতে পারবোনা।
- (.......)
- কী কথা বলছিস না কেনো? তোকে দিয়ে কিছুই হবেনা। নালায়েক একটা।'
সব কিছুর সুযোগ নিয়ে সৎ মা ও বেশ ভালো ভাবে ঝাপিয়ে পড়েছে আমার উপর।
'- আমি তো আগেই বলেছিলাম অর লেখা পড়া বন্ধ করে দাও। আমার কথা তো শুনো নি।
- আহা লেখাপড়া বন্ধ করলে কী হতো? লোকে সেই থু ই দিতো যে কেমন বাপ ছেলেকে লেখাপড়া করাই নি!
- থু তো এখনো দিবে। এতগুলো টাকা পয়সা নষ্ট হতো না অর পিছে।'
মুর্তি হয়ে আমি কেবল সব শুনছি। আমার বলার কিছুই নেই। বাবা কে আজ থামানোর মতো ও কেউ নেই। যে আছে সে বরং আরো উশকে দিচ্ছে। আমা জানা ছিলো আমার hsc খারাপ হবে। এতে আমার কোনো দোষ নেই। আমি অনেক চেষ্টা করেছি। আমি পারি নি। আমি ব্যর্থ। হয়তো বাবা ঠিকি বলছেন আমাকে দিয়ে কিছুই হবেনা। কোনো দিন কিছু করতে পারবো না আমি। বাবা এবং সৎ মা যা খুশি তাই বলে যাচ্ছে। আমার আর সহ্য হচ্ছেনা। ইচ্ছে হচ্ছে মা কে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাদি। মা আমাকে ছেড়ে কোথায় চলে গেলে? তোমাকে ছাড়া আমার একটা মুহূর্ত ভালো লাগেনা।
সেদিনের মতো বাবার বকা ঝকা শেষ হলো। কিন্তু আমার উপর থেকে বিপদ তখনো কাটে নি। নিজের ভেতর ও এক ধরনের লজ্জাবোধ কাজ করছে বাইরের মানুষ কে মুখ দেখাবো কেমন করে? বাড়ির মানুষ ই তো আমাকে ভালো চোখে দেখছে না। রাফি আমার ছোট ভাই। বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলে। আমি রাফিকে প্রচণ্ড আদর করি। কিন্তু রাফির মা রাফিকেও আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমার সামনেই রাফি কে বলছে রিশাদের সঙ্গে মিশবেনা, তাহলে তুমিও অর মতো খারাপ হয়ে যাবে। তোমার রেজাল্ট ও এমন খারাপ হবে। তুমি কী সেটা চাও? রাফি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় 'না'।
এই বিশাল পৃথিবী তে আমি যেনো একদম একাকী হয়ে গিয়েছি। শুধু মাত্র একটা রেজাল্ট আমার জীবন পালটে দিয়েছে। এর মানে আমার জীবনের মূল্য শুধু মাত্র এই রেজাল্ট টাই ছিলো? এতটাই নিকৃষ্ট আমি? দু দিন ধরে ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করছিনা। এতে রাফির মা বেশ খুশি। এতে আমার কষ্ট নেই। কিন্তু বাবা একবারের মতো ও আমাকে খেতে ডাকে নি। এতটাই ঘৃণা করে আমাকে? এতটাই খারাপ আমি?
দিন দিন এই অত্যাচার যেনো তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। বাড়ি থেকে শুরু করে পাড়াপড়শি কেউ ছাড় দিচ্ছেনা। কী এমন দোষ করে ফেলেছি আমি? কেনো এমন আমার এই সমাজ? আমার আর ভালো লাগছেনা। আমি আর পারছিনা। আমি মায়ের কাছে যাবো। মায়ের সঙ্গে থাকবো। এতেই আমি ভালো থাকবো।
আত্নহত্যার পথ আমি কখনো সহজ দৃষ্টিতে দেখিনি। আমি কখনো এর পক্ষেও ছিলাম না। কিন্তু জীবনের কোনো একটা মোড়ে এসে আপনার পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই বদলাবে। যেমন টা আমার সঙ্গে হয়েছে। আমি দ্রুত ছাড়া পেতে চাই। এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
আমাদের বাড়ি ৩ তলা। আমি ছাদে চলে গেলাম। এর থেকে সহজ উপায় আর আমার নজরে আসে নি। বাকি সবই মনে হয়েছে বেশ কঠিন এবং কষ্টদায়ক। সবচাইতে সহজ উপায় টাইই প্রয়োগ করা শ্রেয়। মুখে এক মুচকি হাসি দিয়ে চোখ বন্ধ করে আমি ৩ তলা থেকে লাফ দিয়ে দিলাম। আমার চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেলো। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
'- রিশাদ, আমার বাবা! কেমন আছিস তুই?
- মা!! আমি ভালো আছি। বেশ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
- আমিও বেশ ভালো আছি। কিন্তু তুই যে ভালো নেই বাবা। আমাকে ক্ষমা করে দিস। আমি তোর পাশে থাকতে পারি নি বলে।
- এইযে আমার পাশেই তো আছো তুমি।
- না। তোর কখনো কিচ্ছু হবেনা। চোখ মেলে তাকা।'
'চোখ মেলে তাকা।' 'চোখ মেলে তাকা।' কথাটা বারবার আমার মাথায় ঘুরছে। শব্দ গুলোর প্রখরতা খুব বেশি। আর টেকা যাচ্ছেনা। আমি চোখ মেলে তাকালাম। চার দিক কেমন আলোকিত হিয়ে আসলো। নার্স বাবাকে ডাকছে,
-' মি. মনির সাহেব আপনার ছেলের হুশ এসেছে। আপনার ছেলের হুশ এসেছে। আল্লাহ এর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন দীর্ঘ ত্রিশ ঘন্টা পর হুশ এসেছে।'
চোখ মেলেই প্রথমে বাবাকে দেখলাম। আমি কোনো এক হস্পিটালে। বাবার চোখ কেমন যেনো ভেজা ভেজা। মনে হচ্ছে বাবা কেঁদেছ। এই প্রথম বাবাকে এমন দেখলাম। প্রায় দু দিন পর আমাকে হস্পিটাল থেকে রিলিজ করে দেওয়া হলো।
নিজ বাসাতেই কেমন চোরের মতো করে ঢুকছি। লজ্জাবোধ কাজ করছে। বাবা কিছু বলছেনা আমাকে। কিন্তু রাফির মা থামে নি। সে খুব চেচাচ্ছে বাবার সঙ্গে।
' - তোমার ছেলের সাহস দেখেছো? সে মরার চেষ্টা করেছে। এখানে তার পেছনে কত গুলো টাকা খরচ হয়েছে হিসেব করেছো?
- আহা চুপ থাকো। ওমন অশুভ বলছো কেনো? মরার চেষ্টা কেনো করবে? হয়তো ছাদে পা এলিয়ে বসে ছিলো। তখন কোনো দূর্ঘটনা ঘটে যায়। চুপ করো এখন।
- না কেনো চুপ করবো? ওমন সন্ধ্যা বেলা সে ছাদে পা এলিয়ে বসে থাকে! যেনো কিছু বোঝেনা সে, ছোট খোকা?'
বাবা মা তাদের শোবার রুমে কথা বলছে। আমি আমার ঘর অন্ধকার করে বসে আছি। দূর থেকে রাফি আমার দিয়ে তাকিয়ে আছে। রাফির চেহারায় অনেক মায়া। রাফিকে দেখতে দেখতে আমি আবারো ঘুমিয়ে পড়েছি।
আমার পায়ে প্লাস্টার করা। ফ্রাকচার হয়েছে। তবে আমার কোনো ব্যথা অনুভব হচ্ছেনা পায়ে ভর দিলে। দিব্বি হাটতে পারছি। বাবা আমার সঙ্গে আর কোনো কথা বলে না। আমার খুব কষ্ট হয়। আমি চাই বাবা কথা বলুক। অন্যদিকে রাফির মা সারাদিন চেঁচামেচি করে যাচ্ছে আমার ব্যাপারে। আমার প্রত্যেক্টা কাজ কর্মেই তার সমস্যা। বাবা তাকে চুপ করতে বললেও সে চুপ করছে না। এভাবে আমাকে সারা জীবন কাটাতে হবে? আমি অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি! বাবাও আমাকে আর ভালোবাসে না। ভালোবাসলে নিশ্চই আমার সঙ্গে কথা বলতো!
একদিন তো রাফির মা বলেই উঠলো, 'এভাবে কয়দিন অর বোঝা আমাকে টানতে হবে? আমি পারব না।' আমি কথা টা শুনে নিঃশব্দে আমার ঘরে চলে এলাম। না আমি কারো বোঝা হয়ে থাকতে চাইনা। আমার মা ও বাবার বোঝা হয়ে থাকতে চায় নি তাই আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছেন। আমিও থাকবোনা। কী দরকার মানুষ কে কষ্ট দেওয়ার!
নাইলনের দড়ি দিয়ে বানানো ফাদ বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। আমি কতখন সেখানে তাকিয়ে রইলাম।আমার চোখ দিয়ে পানি বেয়ে বেয়ে পড়ছে। আমার গলায় দড়ি টা ঝুলিয়ে দিলাম। চোখ বন্ধ করে নিলাম। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিছুক্ষণের ভেতরেই আবার কেমন যেনো সব অন্ধকার হয়ে গেলো।
'- মা? কেমন আছো? আমি তোমাকে খুব মিস করি।
- কখনো এমন কাজ করতে যাস নে যাতে করে তোর মা-র খুব কষ্ট হয়।
- মা তোমার কষ্ট হবে?
- ভীষণ কষ্ট হবে। তোর বাবা তোকে ভালোবাসে। অনেক ভালোবাসে।
- মা আমি তোমার কাছে আসছি মা।'
'মা?' 'মা?' 'কোথায় গেলে মা?' হঠাৎ-ই সব কেমন যেনো অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো।
-রাইয়ান বিন ইফতেখার
[গল্পটি পুরোপুরি কাল্পনিক। কারো সঙ্গে মিল রেখে লেখা হয়নি। এবং এখানো রিশাদের কোনো ফলাফল প্রকাশ করা হয় নি। কোনো প্রকার কাজ কর্ম কে এই গল্পে সমর্থন করা হয় নি]

Raiyan Bin Iftekhar Alam

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.