অন্তর্দাহ লগ্ন

অন্তর্দাহ লগ্ন


বাবা মায়ের কথা রাখতে গিয়ে সেদিন নিজের পছন্দের মানুষটাকে ভুলে গিয়ে পরিবারের ঠিক করা মেয়েটাকে বিয়ে করেছিলাম। দুইটা সন্তান ও হয়েছে মোদের ঘরে।
আকাশটা খুব মেঘলা ছিল, এমনি এক মেঘলা দিনেই শেষবারের মত তার সাথে কথা হয়েছিল। আজ আবার খুব মনে পড়ছিল নন্দিতা'কে। ১০ বছর হতে চলেছে। তাকে আনব্লক করে মেসেজ দিলাম। সাথে সাথে সাড়া পাবো ভাবিনি।
*
তোর ওখানে বৃষ্টি হয়?
;হয়তো, রোজ, সর্বক্ষণ।
আমার এখানেও আজ বৃষ্টি হচ্ছে দারুণ।
; তাই বুঝি মনে পড়লো আমাকে?
ঠিক তা'না, কেমন আছিস?
; কেমন রেখে গিয়েছিলি?
ত্যারা কথা! তোর অভ্যাসটা আর বদলালো না!
; বদলেছে, তো! এখন একা থাকা শিখে গেছি।
কেন, আমার মত কাউকে পাসনি বুঝি?
; এমনও তো হতে পারে কাউকে খুঁজিনি!
কেন খুঁজিসনি, জানতে পারি আমি?
; এ হৃদয়ে আবার বিরহের ব্যথা সইতে পারবো না!
এত ব্যথা দিয়েছিলাম নাকি আমি?
; সেটা তুই কি বুঝবি! তুই তো ব্যথা পাসনি!
আমি কি তোকে ছেড়ে একটুও ব্যথা পাইনি?
; রাখ ওসব কথা, তোর সন্তান কেমন আছে?
ভালো, একটা মেয়েও হয়েছে। নন্দিতা রেখেছি নাম।
; আমার নামটাই রাখার কি দরকার ছিল বুঝলাম না!
তুই কিছুই বুঝিস না! বাদ দে! বিয়ের ফুল ফুটবে কবে?
; বিয়ে! বিয়ের ফুল ফুটেছিল তো! তুই গাছটা নষ্ট করে দিয়ে চলে গেলি, অন্য গাছে, ভিন্ন ফুলে! এখন সে মৃত!
*
তারপর আর আমি কিছু বলতে পারলাম না। আবারো মনের সব কথা চেপে নন্দিতা'কে ব্লক লিষ্টে ফেলেছি। হয়তো কখনো নন্দিতা'কে আমি আর মেসেজ দিবনা! আকাশ টা আজ দারুণ মেঘলা। আমার মনের আকাশে ও আজ মেঘেদের ভেলা উড়ে উড়ে যায়। আমি ব্যথিত। মর্মাহত। সেদিন ও মর্মাহত হয়েছিলাম। কেউ বুঝেনি!
সেদিন হয়েছিল কি, বাবার এক বন্ধুর মেয়ের বিয়ে ছিল। আমরা নিমন্ত্রণ্য খেতে গিয়েছিলাম। তারপর ওখানে হলো কি, কি এক কারণে বর আর আসলো না। বাবার বন্ধুর মেয়েটা লগ্নভ্রষ্টা হতে চলেছিল। সনাতন সমাজ মাত্রই জানেন লগ্ন ভ্রষ্টা মেয়ের আর পাত্র পাওয়া যায় না। এলিট শ্রেণীর সনাতনী সমাজও লগ্নভ্রষ্ট মেয়েকে মেনে নেয় না। যেমন পূর্বের সতীদাহ! সতীদাহ প্রথা বিল্লুপ্ত হলেও এখনো আছে কিছু কোথাও কোথাও, যেখানে এখনো সভ্যতার আলো পৌঁছায়নি! সে কথা না বলছিনা। বলছিলাম লগ্নভ্রষ্টা প্রথা নিয়ে!
তারপর আমার বাবা তার বন্ধুর দুঃখলাঘবের জন্য আমাকে বলি চড়ালেন। পারিপার্শ্বিক অবস্থা এমন ছিল আমি কারো বিরোধিতা কর‍তে পারিনি! বলির পাঠাটাও ছটফট করে শেষ অবধি এসে, কিন্তু আমি যেন যন্ত্র মানবের মত সব করে চলেছি হেসে খেলে!
নন্দিতাকে আর ওসব বলার সাধ্য হয়নি। ফুল শয্যার রাত্রিরেই ওকে চির বিদায় বলে ব্লক লিষ্টে রেখিছিলাম। সেদিন আকাশ ঠিক এমনি মেঘলা ছিল। ঠিক এমনিই।
তারপর একদিন স্ত্রীর মুখে শুনেছিলাম, নন্দিতা নামের কেউ এসেছিল আমার খোঁজে, বাচ্চাকে চকলেট দিয়ে গেছে। আমি 'ওহ' বলে চলে গিয়েছিলাম বাথরুমে। চোখের জল ফেলেছিলাম আড়ালে। আমাকে আর কখনো আমার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করেনি কিছু নন্দিতার ব্যাপারে! হয়তো ও বুঝেছিল, আমার সেদিনের চেহারা দেখে!
তারপর আজকে মেঘলা আকাশ। মনের আকাশেও মেঘের ভেলা উড়ে উড়ে যায়। আমি নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকি। মন খারাপ হয় না এখন আর। ভালবাসতে ইচ্ছে করলেও ইচ্ছাটাকে পাত্তা দেই না। হঠাৎ নন্দিতা এসে আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে, "পাপ্পা, পাপ্পা, আমাকে আইস্ক্রিম কিনে দিবে?" আমি ওকে শোধাই, "আজ তো ঠান্ডা দিন। আইস্ক্রিম খেলে আমার পাপ্পার ঠান্ডা লেগে যাবে তো!"
.
.
.


Arfin Rafi Shohel

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.