স্বপ্নে দেখা বউ


স্বপ্নে দেখা বউ

.
লেপের ভেতর থেকে গুনে গুনে পাঁচবার বের হয়েছি। শীতের মধ্যে এতোবার লেপের উষ্ণ আলিঙ্গন থেকে বের হওয়াও একটা বিরাট ত্যাগের বিষয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমার এই ত্যাগ আমার বউের চোখে পড়ছেনা। চোখে পড়ছেনা নাকি সে দেখেও না দেখার ভান করতেছে ঠিক বুঝতে পারছিনা। বসার রুমে সোফার উপর পা তুলে বসে আম্মার সাথে দিব্বি গল্পে মেতে আছে। একটু পরপর খিলখিল করে হাসির শব্দ পাচ্ছি। প্রতিবার বসার রুমের ভেতরে উঁকি দিয়ে কেশে আসতেছি। পঞ্চমবার আম্মা বললেনতোর কি ডায়বেটিস হয়েছে কতোবার বাথরুম যাস? নাকি পেট খারাপ? আর খকখক করে কাঁশতেছিস কেন। কাশের সিরাপ আছে আমার ঘরে যা খেয়ে নে।
আম্মার কথা শুনে বউ খিকখিক করে হাঁসতে শুরু করলো। আমার রাগ করা উচিত কিন্তু তার বাঁকা দাঁতের হাসিতে রাগ করা যায়না।
নতুন বিয়ে করেছি কিসের বউয়ের সাথে মিষ্টি মধুর দুটো রোমান্টিক কথা বলবো সে সুযোগ পাচ্ছিনা। বউ ধারে কাছে আসতে চাচ্ছেনা। মন খারাপ করে মাথা পর্যন্ত লেপ টেনে নিয়ে শুয়ে আছি।
--এই তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছো?

.
বউয়ের কন্ঠ শুনে লেপের ভেতর থেকে বের হয়ে বসে পড়লাম।
-না তো

.
--নাও এটা খেয়ে নাও

.
-কিসের জন্য?

.
--বুড়াদের মতো খুকখুক করে কেশে বেড়াচ্ছো সিরাপটা খাবেনা।

.
-আরে সেটা তো সিগনাল দিচ্ছিলাম। তোমাকে আসার জন্য।

.
--মুখে বললেই হতো।

.
-আম্মা আছে না, কি না কি ভাববে।

.
--তুমি যে বারবার ঘরে উঁকি দিয়ে কেশেছো তাতে বুঝি কিছু ভাবেনি।

.
তার কথা শুনে চিন্তায় পড়ে গেলাম। বউ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে। তার নাকের নাকফুলের ছোট্ট পাথরটা চকচক করছে। বউ হাসি থামিয়ে বললোঃ
--তোমাকে কিছু বলতে চাই।

.
-বলো

.
--আমার লজ্জা লাগছে তুমি চোখ বন্ধ করো।

.
আমি চোখ বন্ধ করলাম। নিজেকে এই মুহূর্তে কোন হিন্দি রোমান্টিক সিনেমার নায়ক মনে হচ্ছে। বউ বললোআমি তো ভালা না ভালা লাইয়া থাকো
আশ্চর্য বউ এসব কি বলে। চোখ খুলে দেখি চারপাশ অন্ধকার। এতেক্ষন কি স্বপ্ন দেখছিলাম? মনটা খারাপ হয়ে গেলো। হোক স্বপ্ন কিন্তু সে কি বলতে চাইলো সেটা শোনা হলোনা সেটাই মন খারাপের বিষয়। ফোনটা বেঁজেই যাচ্ছেআমি তো ভালা না ভালা লইয়াই থাকো মেজাজটা চরম খারাপ হয়ে গেছে, হাতড়িয়ে ফোনটা রিসিভ করলামঃ
-কোন সালা রে।

.
--দোস্ত আমি

.
-তুমি হইছো তো কি হইছে মাঝ রাতে কল দিবা ক্যান। বাপে ভদ্রতা শেখায় নাই?

.
--সালা সকাল এগারোটা বাঁজে তোর এখনো মাঝরাত। লেপের ভেতর থেকে মাথা বের কর।

.
লেপের ভেতর থেকে মাথা বের করে দেখি সত্যি অনেক বেলা হয়ে গেছে।
-হোক সকাল তুই ফোন দিছস ক্যান?

.
--পরীক্ষা দিতে যাবিনা?

.
-কিসের পরীক্ষা?

.
--জানিনা, ডিপার্টমেন্ট থেকে মেসেজ দিছে।

.
-কল দিয়ে জিজ্ঞাসা কর কিসের পরীক্ষা।

.
--কল দিছি রিসিভ করেনা। তুই কল দে।

.
ফোনটা কেটে দেখলাম আমারেও মেসেজ দিছে। কল দিলাম লাভ হলোনা। ফোন কেটে মেসেজ দিলোএকটায় পরীক্ষা ইচ্ছা হলে পরীক্ষা দে নাহলে বাঁশ খা। ফোন দেয়া নিষেধ।ইদানিং মাস্টারেও মজা নিতে শিখে গেছে। কি আর করার লেপের ভেতর থেকে বের হয়ে ব্রাশ, গোসল সেরে সাইকেলটা নিয়ে চলে গেলাম পরীক্ষা দিতে। জানতে পারলাম যারা পরীক্ষায় ফেল করছে তাদের আবার পরীক্ষা নেয়া হবে। স্যারকে বললামঃ
-স্যার পরীক্ষা কি দিতেই হবে?

.
--হুম

.
-স্যার আমি তো ফেল করিনাই।

.
--ফেল না করলে তো ডিপার্টমেন্ট থেকে মেসেজ দিবেনা। পরীক্ষা দিছিলি?

.
-না স্যার।

.
--পরীক্ষা দিসনি আবার কথা বলতে আসছিস যা খাতা নিয়ে বস।

.
পরীক্ষায় মনোযোগ দিতে পারছিনা বারবার স্বপ্নে দেখা সেই বউয়ের কথা মনে পড়ছে। চোখ বন্ধ করলেই যেন তার চেহারা দেখতে পাচ্ছি। চার ঘন্টার পরীক্ষা সবাই এক ঘন্টার মধ্যে খাতা জমা দিয়ে দিলো। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিনিয়র স্টুডেন্ট বলে কথা, বোর্ড পরীক্ষা ছাড়া কোন পরীক্ষা কেউ ভয় পায়না। আমি সামনের লো বেঞ্চের উপর পা তুলে দিয়ে আরামসে বসে লিখছি। কি লিখছি জানিনা তবে এটা জানি খাতা কাটার সময় স্যারের মাথা খারাপ হয়ে যাবে। পরীক্ষার মার্ক দেয়ার জায়গায় হারামজাদাও লিখে দিতে পারেন। স্যার ডাক দিলেনঃ
.
--কিরে সবাই তো চলে গেলো, খাতা জমা দে।

.
-দিতাম না। চার ঘন্টা পরীক্ষা চার ঘন্টাই লিখমু।

.
মনে মনে বললাম আমার ঘুম নষ্ট করেছো। এতোখানি পথ আনিয়েছো। জবরদস্তি পরীক্ষা নিচ্ছো। ভেবেছো কি এসব করে পার পেয়ে যাবে। তোমরাই পারো আমি পারিনা। চার ঘন্টাই পরীক্ষা দিমু। নিজেও খাতা নিয়া বইসা থাকমু আপনেরেও বসায় রাখমু। দশ মিনিট পরে স্যার বললেনঃ
--খাতাটা জমা দে পাশ মার্ক দিয়ে দিবো টেনশন নিসনা।

.
-না স্যার চার ঘন্টাই পরীক্ষা দিমু।

.
এক ঘন্টা স্যাররে বসায় রাখছি নিজেও খাতা নিয়ে বসে আছি। স্যারের মুখে স্পষ্ট বিরক্তি দেখতে পাচ্ছি। স্যার দাঁড়া হয়ে বললেনঃ
--দে পরীক্ষা দে আমি চা খেয়ে আসি।

স্যার বের হওয়ার সময় হল রুমের দরজা বাইরে থেকে লক করে দিলেন। স্যারেও বদ আছে। হাবিজাবি লিখে খাতা ভর্তি করে ফেলছি। এক্সট্রা পাতা নিবো সেই উপায় নেই কারন স্যার দরজা বাইরে থেকে লক করে দিয়ে চা খেতে গেছেন। ফোন বের করে দুটো সেল্ফি নিলাম। বসে বসে স্টেটাস লিখতেছি স্যারের কন্ঠ শুনতে পেলামঃ
--কিরে নকল করিস নাকি?

.
চারদিক মাথা ঘুরিয়ে দেখি স্যার জানালার সাথে মাথা লাগিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
-না স্যার খাতা শেষ।

.
--জমা দে।

.
-চার ঘন্টার আগে জমা দিবো না স্যার। এক্সট্রা পাতা দেন।

.
--অনেক জ্বালাইছিস খাতা জমা দিয়ে ভাগ। ফোন বের করছিস সেটার জন্য নাহলে কেস খাবি।

.
স্যারের সাথে পাঙ্গা নিলাম না আর। ভদ্রভাবে খাতা রেখে বের হয়ে আসলাম। রুমে ঢুকে দেখি আব্বাহুজুর আর আম্মা বসে টিভিতে নিউজ চ্যানাল দেখছেন। রিমোটটা নিয়ে গানের চ্যানালে দিয়ে টিভির কাছাকাছি চেয়ার নিয়ে বসলাম। আব্বাহুজুর আর আম্মার কিছু কিছু কথা শুনতে পাচ্ছি। আব্বাহুজুর কোন মেয়ের প্রশংসা করছেন তাই তার কথায় মনোযোগ দিলাম-
বুঝলা সালাম ভাইয়ের মেয়েটা একদম পরীর মতো দেখতে হয়েছে। এতো সুন্দরী মেয়ে। ওই যে টিভিতে যেই নায়িকাটাকে দেখাচ্ছে তার থেকেও সুন্দরী।

টিভির দিকে তাকালাম। টিভিতে শ্রদ্ধা কাপুর নাচছে। আব্বাহুজুর এর পরে যে কথাটা বললেন সেটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কথাটা শোনার পরে বুকটা ধ্বক করে উঠলো। আব্বাহুজুর বললেনঃ
আমাদের আলিফ যদি একটা চাকরি-বাকরি করতো তাহলে তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিতাম। কিন্তু কি করার আমাদের ছেলে তো অলস, নাল্লা

আমি আব্বাহুজুরের দিকে তাকিয়ে বললামঃ
-আব্বা কি বললেন?

.
--নাল্লা, হিন্দি চ্যানাল থেকে গালিটা শিখেছি। নাল্লা মানে মনে হয় অপদার্থ।

.
-সেটা বলছিনা, তার আগে কি বললেন?

.
-- আচ্ছা। না মানে বলছিলাম তোর যদি চাকরি বাকরি থাকতো তাহলে তোর বিয়ের প্রস্তাব দিতাম আরকি।

.
আব্বাহুজুরের কথা শুনে ইচ্ছা করছিলো দৌড়ে গিয়ে তাকে একটা চুমু খাই। আহা তিনি ছেলের বিয়ের কথা ভেবেছেন এর থেকে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে। এতোদিনে তিনি বুঝেছেন যেতোমাকে বিয়ে করে আমার জীবন নষ্ট হয়ে গেলো বা তোমাকে বিয়ে করা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলোকথাগুলো বলার জন্য হলেও আমার একটা বউ চাই। আব্বাহুজুরকে বললামঃ
-আব্বা সেদিন আপনি একটা চাকরির কথা বলছিলেন না। সেটার ব্যবস্থা করেন না।

.
--তুই তো নাকি চাকরিটা করবিনা, তোর নাকি পছন্দ না।

.
-না তা না, রাতে অনেক ভাবছি। ভেবে দেখলাম চাকরিটা ভালো। করা যায়।

.
--আচ্ছা ঠিক আছে দেখি চেষ্টা করে।

.
ইচ্ছা করছিলো আব্বাহুজুরকে বলি যেচাকরিতে জয়েন করা মাত্র আপনি কিন্তু বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবেন।কিন্তু বললাম না সবকিছু বলার একটা সঠিক সময় থাকে। সময় আসুক তখন বলবো। রিমোটটা আব্বাহুজুরের হাতে দিয়ে নিজের ঘরে এসে খুশিতে বিছানায় এপাশ থেকে ওপাশ দশবার গড়াগড়ি খেলাম, পা দুটো উপরের দিকে তুলে হাওয়ায় কিছুক্ষন সাইকেল চালাইলাম। তারপর বিছানার এপাশ থেকে ওপাশে ডিগবাজি দিতে গিয়ে কাঠের সাথে মাথায় বাড়ি খেলাম। মাথা মালিশ করতে করতে আনন্দ প্রকাশ করা বন্ধ করে কোল বালিশটা কোলের উপর নিয়ে এক্স গার্লফ্রেন্ডকে কল দিলামঃ
--হ্যালো

.
-আমি বিয়ে করতেছি। তোর থেকে সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করতেছি। মেয়ে নায়িকার মতো দেখতে। তোর টাকলা বর কেমন আছে।

.
--হারামজাদা ফোন দিছিস ক্যান। আসছে হিরো আলম নায়িকার থেকে সুন্দরী বিয়ে করতে। ভুলেও আর কল দিবিনা নাহলে হাজবেন্ডকে বলে পিটুনি খাওয়াবো তোকে। রাখ ফোন রাখ।

পিটুনি খাওয়ার ভয়ে ফোন রেখে দিছি। বুঝিনা ভাইরাল হয় হিরো আলম আর ট্রল করা হয় আমাদের নিয়ে। হোয়াট ইজ দিজ। মনে মনে নিজেকে সান্তনা দিলাম হয়তো সে বিয়ের কথা শুনে মনে মনে জ্বলতেছে প্রকাশ করতে পারছেনা তাই গালি দিচ্ছে।
.
সময় যতো যাচ্ছে সুন্দরীকে দেখার জন্য মন ততো আনচান করছে। কোন কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিনা। বুকের মধ্যে ভালোবাসা ঝড় তুলেছে। সুন্দরীকে একবার দেখা দরকার, খুব দরকার। নিজের হবু বউ বলে কথা। কোন উপায় না দেখে কাপড় পাল্টে ভাতিজার বাড়ি হাজির। একা একা তো শশুড়বাড়ি যাওয়া যায়না, লজ্জা শরমের একটা ব্যাপার আছে। ভাতিজাকে সাথে নিয়ে গেলে লজ্জাটা কম লাগবে। গিয়ে দেখি ভাতিজার প্রাইভেট টিউটর এসেছে। বেচারাকে নিয়ে বড় ভাই বিরাট টেনশনে আছেন। ক্লাস থ্রিতে একবার ফেল, ক্লাস সেভেনে দুবার জেএসসি দুবারে পাশ করেছে নাইনের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে এসে বলেছে আব্বা ফার্স্ট ক্লাস পরীক্ষা হইছে গোল্ডেন সিউর। গোল্ডেন না তোরে ডায়মন্ড দিবে, যতোবার একথা বলেছে সে ততোবার ফেল মেরেছে। আমাকে দেখে ভাবি বললেনঃ
--তুই কোথা থেকে খবর পেলি আমার বোন এসেছে?

.
-ভাবি তোমার বোন আসছে নাকি?

.
--তুই জানিসনা?

.
-নাতো

.
--প্রতিবার তো খবর পেয়ে চলে আসিস। ভাবলাম এবারো খবর পেয়ে এসেছিস। তা আসার কারন কি?

.
-আছে কারন। তবে তোমার বোনকে আর দেখতে আসবোনা। বিয়ে করতেছি তোমার বোনের থেকে সুন্দরী মেয়ে। তোমার বোনের মতো আটা ময়দা সুন্দরী না।

.
--বলিস কি তোর বিয়ে মানে, কিছুই তো জানলাম না।

.
-ওসব পরে শুনিও তোমার ছেলেকে ডাক দাও, যতো পড়ুক লাভ নেই দুবার ফেল না করে সে নাইন পাশ করবেনা।

.
--তুই চাচা হয়ে অলুক্ষনে কথা বলিসনা তো।

.
-বিশ্বাস না হলে গিয়ে দেখ সে পড়া বাদ দিয়ে স্যারকে যেই নাস্তা দিয়ে এসেছো তোমার ছেলে বসে সেটা খাচ্ছে।

.
ভাবি উঁকি দিয়ে দেখলেন সত্যি তিনি টিচারকে যেই নাস্তা দিয়ে এসেছেন তার ছেলে খাচ্ছে বেচারা মাস্টার হা করে তাকিয়ে আছে। আমি একটু ভাবির রুমে গেলাম তার বোনকে কিছু কথা বলা দরকার। দুবছর ধরে লাইন মারছি সে পাত্তা দিচ্ছেনা।
-এই যে শুনছেন

.
--জ্বি বলেন।

.
-এতো ভাব নিস ক্যান। নিজেরে খুব সুন্দরী ভাবিস? মেকআপ ধুয়ে ফেলার পরে তো নিজেই নিজেকে চিনতে পারিস না। আর এতো ঢং করে কথা বলিস ক্যান? মাঝে মাঝে তোর ঢং দেখলে ইচ্ছে করে এক নাম্বার ইট দিয়া তোর দাঁত ভাঙ্গে দেই। আর ভাব কম নে, খবরদার যদি আমার সামনে আর কখনো ভুলেও ভাব নিছিস পেছনে কুত্তা লেলিয়ে দিমু। এক্কেরে তোরে এলাকা ছাড়া করবে।

.
ভাবির বোন টাশকি মেরে দেখে আছে আমি ভাতিজাকে নিয়ে বের হলাম। আমি বাইকে বসতে ভয় পাই, ভাতিজার চালালে তো কথাই নাই কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। পাগল মানুষ তিড়িং বিড়িং করে বাইক চালায়। একবার তার বাপকে পেছনে বসিয়ে বাইকের সামনের চাকা তুলে স্টান্ড দেখাতে গেছে বেচারা বাইক থেকে নিচে পড়ে হাত ভাঙ্গছে। ইমার্জেন্সি না হলে আমি তার বাইকের পেছনে বসিনা। আজ বসেছি, কারন আজ ইমাজেন্সি, অত্যান্ত ইমারজেন্সি।
সন্ধ্যায় পৌঁছালাম হবু শশুড়বাড়ি, লজ্জায় বাসায় ঢুকতে পারছিনা। গেটের সামনে দশ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছি। ভাতিজার মাথায় হেলমেট কিন্তু সে বাইরের গেটের ফুটা দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করছে হুট করে দরজা খুলে ভাতিজাকে দেখে একজন আল্লাহগো বলে চিৎকার দিয়ে আবার দরজা বন্ধ করে দিলো। মনে হয় ভাতিজা হেলমেট পড়ে থাকার কারনে বেচারা দেখে ভয় পেয়েছে। দরজার ওপাশ থেকে একজন ভীত গলায় বললেনঃ
--কে?

.
ভাতিজা বললোঃ
--আমিআপনাদের কুটুম বাড়ির লোক। চাচি কোথায় চাচিকে দেখতে এসেছি।

.
--কোন চাচি?

.
-আমার চাচি

.
--তোমার চাচি কে?

.
ভাতিজা কিছু বলতে যাচ্ছিলো আমি থাকে থামিয়ে বললাম সালাম চাচা আমি আলিফ, অমুকের ছেলে। আব্বার নাম বলার পরে সালাম চাচা দরজা খুলে দিলেন। ভাতিজার দিকে তাকিয়ে বললেনঃ
--এটা কে?

.
-সাকিব, রাসেল ভাইয়ার ছোট ছেলে।

.
--আসো ভেতরে আসো।

.
বসার রুমে সোফায় চাচা ভাতিজা বসে আছি। হেলমেট পড়েই বসে আছে। তাকে অনেকবার বলেছি হেলমেট খুলতে সে খুলেনি। তার বাপ নাকি আদেশ দিয়ে বলেছে বাইক নিয়ে বের হলে অবশ্যই হেলমেট সাথে নিবি, খবরদার কখনো হেলমেট খুলবিনা। পাগলকে কে বুঝায় যে এখন হেলমেট খুললে অসুবিধা নেই। আমাদের নাস্তা দেয়া হয়েছে। হেলসেটের কারনে খেতে পারছেনা বলেই ভাতিজা বিস্কিট পকেটে ঢুকিয়েছে। সালাম চাচার সরি শশুড়আব্বার মেয়ে কোথায়। যার জন্য এতোখানি পথ পাড়ি দিয়ে আসলাম তার কোন খোঁজ নেই। বুকের মধ্যে ধুকধুকনি শুরু হয়েছে। কতো শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত পেরিয়েছে তাকে ছাড়া। আজ এতো বছরের অপেক্ষার পরে তাকে প্রথম দেখার জন্য আর দেরি সহ্য হচ্ছেনা। তাকে এক পলক দেখার জন্য চোখে যে পৃথিবীর সব তৃষ্ণা ভর করেছে, অপেক্ষার প্রখর তাপে আবেগের ভূমি যে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে আজ তার মুষলধারায় বৃষ্টির বড্ড প্রয়োজন। অপেক্ষা করতে না পেরে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে হবু শশুড়আব্বাকে বলেই ফেললামঃ
-আঙ্কেল আপনার মেয়েকে যে কোথাও দেখছিনা।

.
--মা ফারজানা কই তুই, তোর আলিফ ভাইয়া এসেছে তোকে দেখতে চাচ্ছে।

.
যাকে দেখার জন্য চোখে এতো তৃষ্ণা নিয়ে বসে আছি এই তাকে প্রথম দেখা। মেরুন রঙের একটা জামা তার গায়ে। সে মনে হয় আমাদের সামনে আসতে লজ্জা পাচ্ছে। দরজা ধরে দাড়িয়ে আছে। ঠোটে লাজুক হাসি, ঠোটের আড়ালে সামনের পাটির একটা দাঁত নেই। সালাম চাচার দিকে তাকিয়ে বললামঃ
-এটা আপনার মেয়ে?

.
--হুম

.
-আপনার আর মেয়ে নেই?

.
--না। একটাই মেয়ে।

.
মনে মনে বললামনা হতে পারেনা। ধোকা হ্যায়, আমি খেলতাম না।বুঝতে পারলাম আব্বাহুজুর আমাকে মুরগী বানিয়েছেন। তিনি এই কাজটা কেন করেছেন জানিনা। জানতেও চাইনা কেউ আমারে মারি ফেল। ভগ্ন হৃদয় নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বাচ্চাটার হাতে বিশ টাকা দিয়ে বললামআপু নে চকলেট কিনে খাইস।মনে মনে বললাম দশটা বছর আগে জন্ম নিতি। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সালাম চাচা হাতে চশমা ধরিয়ে দিয়ে বললেনঃ
--তোমার বাবার চশমাটা সকালে রেখে গেছে নিয়ে যাও।

.
ভাতিজার মাথা থেকে জোর করে হেলমেট খুলে নিয়ে নিজে পড়েছি। হেলমেটের আড়ালে কিছুক্ষন অশ্রু বিসর্জন দিবো। আব্বাহুজুকে কল দিলামঃ
--হ্যালো

.
-আব্বা কাজটা কি ঠিক করলেন?

.
--কি করছি?

.
-পিচ্চি বাচ্চা একটা মেয়ে কেবল ছোটবেলার দাঁত পড়তে শুরু করেছে তার সাথে বিয়ে দিবেন? ক্যান ধোঁকা দিলেন।

.
--জানতাম বিয়ের কথা বললে হয় তুই চাকরিটা করবি নাহলে তাদের বাসায় যাবি। গেছিস যখন চশমাটা নিয়ে আসিস। ব্যাপার কি কথা শোনা যাচ্ছেনা কেন, তুই কি বাসে জানালার পাশে বসছিস নাকি বাতাসের জন্য কথা শোনা যাচ্ছেনা।

.
-আমি বাইকে

.
--কার বাইকে?

.
-সাকিবের।

.
--খাইছে সাবধানে আসিস। চশমাটা নিছিস তো?

.
-চশমাটা সাকিবের চোখে।

.
ফোনটা কেটে দিলাম। ভাতিজা উরাধুরা গতিতে বাইক চালাচ্ছে। চশমার কারনে কাছে জিনিস দূরে দেখতে পাচ্ছে, এক সাকেলওয়ালার পেছনে একটুর জন্য ধাক্কা দেয়নি। এখন ভয় লাগছেনা কারন আমি দুঃখের মধ্যে আছি। বিয়ে ভাঙ্গার দুঃখ বড় দুঃখ জানা ছিলোনা। ভাবির বোনকেও আর লাইন মারতে পারবোনা। কি হবে জীবন রেখে। কথাটা ভাবা মাত্র ভাতিজা বাইক রাস্তা ছেড়ে ধান ক্ষেতে নামিয়ে দিয়েছে। আমি চিৎ হয়ে পড়ে আছি ভাতিজা দাঁড়া হয়ে দৌঁড়ে রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়া হয়েছে। আমি মনে হয় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি ঘুম ঘুম পাচ্ছে অজ্ঞান হবার আগে দূর থেকে ভাতিজার কন্ঠ শুনতে পারলামএখন আমার কি হবে, আমি দাদার চশমা ভাইঙ্গা ফালাইছি। আল্লাহরে আমাকে বাঁচাও। চোখের সামনে স্বপ্নে দেখা সেই বাঁকা দাঁতেও হাসিওয়ালিকে দেখতে পাচ্ছি, তার নাকের নাকফুলের পাথরটা চকচক করছে।।



Ni Alif

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.