যুগলবন্দি


যুগলবন্দি



এই শেষ, অনেক হইছে, এনাফ ইজ এনাফ। এই জনমে আর যদি ফোন দিছি তোমারে! তুমি একটা চরম ফালতু, আই হেইট ইউ'
চিৎকার করে এইসব বলতে বলতে ফোন কাটল মায়া। হতভম্ব আরিফ বসে রইল কিছুক্ষণ। কী করবে বুঝতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে কল ব্যাক জেদের আগুন বাড়িয়ে দেয়। রিস্ক নিল না।
মিনিট দুয়েক পর ফের ফোন।
কষ্টের মধ্যেও হাসি পেল আরিফের। রিসিভ করে ওপাশে কোন সাড়া-শব্দ পেল না। কেবল প্রগাঢ় নি:শ্বাসের শব্দ। আরিফ হ্যালো হ্যালো করল। তাও জবাব এলো না। 
আরিফ বলল, 'এক জনম যে এতো তাড়াতাড়ি শেষ হয়, জানা ছিল না। যা করে থাকতে পারো না, তা করো কেন?'
এবার ঝাঝালো কন্ঠ, 'কী না করে থাকতে পারি না?'
'
এই যে কথা না বলে। দম বন্ধ হয়ে আসে, নি:শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তাহলে হুমকী দেও কেন?'
'
পারি না বলেই তো পেয়ে বসেছো!'
'
শান্ত হও। এতো যে রাগ করছো, কী করলাম আমি?'
'
কিছুই করোনি তুমি? আমাকে ব্যস্ততা দেখাওনি?' 
'
আরেহ্ বাবা, অফিসে ব্যস্ত থাকলে বলবো না?' 
'
না বলবা না, আমাকে ব্যস্ততা দেখাবা না তুমি। আমি তোমাকে ব্যস্ততা দেখাই? বলি যে আমাকে ১২ ঘন্টা ল্যাব করতে হয়, রান্না করতে হয়, সুপারভাইজারের সঙ্গে সেশন করতে হয়, বলি? তুমি যখনই ফোন দেও, আমি যে কাজেই থাকি, সঙ্গে সঙ্গে ফ্রি হয়ে যাই। প্রশ্নটা ব্যস্ততার না, গুরুত্বের। তোমার কাছে আমার গুরুত্ব কমে গেছে!'
শেষ দিকে মায়ার কন্ঠটা কেমন ভারি হয়ে উঠল। দুকুল ছাপিয়ে বন্যার আগে নদী যেমন ফুলে ওঠে, ওর মায়াবী চোখজোড়াও কী এখন তাই? আরিফের খারাপ লাগে। অপরাধবোধ জাগে। 
মায়ার আদ্র গলা শোনা যায়, 'দেড় বছর তোমাকে দেখি না আমি। দেড় বছর মানে বোঝো? সাড়ে পাঁচশো দিন। এই ভীনদেশে কী আমি আসতে চেয়েছিলাম? তুমিই জোর করেছো। বলেছো, ক্যারিয়ারটা গুছিয়ে নাও। এতো কিছু চেয়েছি আমি? আমি তোমার কাছাকাছি থাকতে চেয়েছিলাম, তোমাকে ঘেষে থাকতে। এইসব স্কাইপ, ভাইবার আমার ভালো লাগে না। তোমার চুল এলোমেলো করে দিতে ইচ্ছে হয়, ইচ্ছে হয় ক্লান্ত মুখটা ওড়নায় মুছিয়ে দেই। তুমি এসবের মানে বোঝো? বোঝো প্রিয় স্পর্শ বঞ্চিত হবার কষ্ট?'
আরিফের সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে। 
অফিসের করিডোরে এমন বিব্রত হবার মানে হয় না। তবু নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল না আরিফ। সে কাঁদতে চাইলো। পরিণত বয়সের যুবক একা দাঁড়িয়ে কাঁদছে, এই দৃশ্যটা কে দেখল, কে দেখল না, তাতে ওর কিছু আসে যায় না। মায়ার চোখে পানি এলে ওর আসে যায়, ভীষণ রকম আসে যায়।
আমি জানি, বিশেষ দিবসে, মন কেমন করা বসন্ত বিকেলে, পার্ক কিংবা রেস্টুরেন্টে যুগলবন্দি ভালোবাসার বহি:প্রকাশ দেখলে এই শহরের কিছু মানুষের চোখের জমিন ভিজে ওঠে। শত মাইল দূরে থাকা প্রিয় মানুষটার কথা ভেবে হু হু করে পরাণের গহিন ভেতর। 
সেইসব প্রেমিক হৃদয়ের জন্য অনন্ত প্রার্থনা, ভৌগলিক দূরত্ব যাদের মমতাময় ভালোবাসাকে একটুকুও স্পর্শ করতে পারেনি। পাশাপাশি না থেকেও, প্রিয় হাত না ছুঁয়েও যে ভালোবাসার উষ্ণতায়, অনুভূতির তীব্রতায়, দুটি হৃদয় প্রগাঢ় ভাবে ছুঁয়ে থাকা যায়, প্রতি মূহুর্তে এই অমোঘ সত্য তারা প্রচার করে চলেছেন। এমন ভালোবাসাকে বিনম্র শ্রদ্ধা। এইসব ভালোবাসা মিছে নয়


আবদুল্লাহ আল ইমরান


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.