রঙের টেক্কা

রঙের টেক্কা


সন্ধ্যেটা আজ বড্ড বেশি বেহায়া আর অমানবিক মনে হচ্ছে। নিশ্চুপ কিছু ভাবনা আর অপ্রয়োজনীয় অনুভুতিরা বুকের বাঁ পাশটা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। হয়তো বা কেউ আমায় মনে করছে, নয়তো বা আমি কাউকে!
চারপায়ার এক পাশে এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে থাকা তাসের কার্ডগুলি খানিকটা নাড়াচাড়া করে গুছিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টায় মগ্ন হলাম। রঙ এর টেক্কা-টা হাতে নিতেই চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যেতে থাকলো।
আজ ৪ঠা অগ্রাহায়ন। এ জন্যই হয়তো বা বুকের বা পাশটায় এসিড নির্গত হচ্ছে অবিরত।
একটু পরেই বাস ছেড়ে দেবে হয়তো। ধোঁয়া ওঠা কফির মগটা কখন যে শরবত হয়ে গেছে টের ই পাইনি! ও হয়তো খুব করে চেয়েছিলো গরম অবস্থাতেই আমি ওটাকে নিঃশেষ করে দেবো। কিন্তু তা তো হলোই না, ভাগ্যদেবী চায়নি, তাই হবে হয়তো।
পূবের জানালার ধারে গুছিয়ে রাখা লাগেজ নামক বস্তটা হাতে নিয়ে শেষ বারের মতো আয়নার সামনে দাড়ালাম। মনে হচ্ছে কপালের টিপটা ঠিক যায়গা তে ই আছে। তবে এ নিয়ে মাথা ব্যাথা ফুড়িয়েছে বছর চারেক আগেই।
বাস এসে ইতিমধ্যে ফেরীতে উঠেছে। বাসের জানালা দিয়ে বাহিরে তাকানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ব্যর্থ হলাম। কিছুই দেখতে পেলাম না পাশে দাড়ানো বাস নামক জড়বস্তুটা ছাড়া।
নিজের যায়গা টা ছেড়ে দড়জা দিয়ে বাহিরে এসে দাড়ালাম। সামনে তাকাতেই খানিকটা ফাঁকা জায়গা দেখে দাড়ালাম যেয়ে। পূর্ন চাঁদটা আলো ছড়াচ্ছে সম্পর্ন সূর্যের কাছ হতে ধার করে। তবুও এই চাঁদের কত শত ভক্ত!
এমনই কোনো একরাতে এই ফেরীতে ই পরিচয় হয়েছিলো আমার আর মাহফুজের। তখনো ছিলো ভরা পূর্নিমার পূর্নতা আর খানিকটা শীতল বাতাস। চোখে একজোড়া কালো ফ্রেমের চশমা আর সাদা শার্ট পরিহিত অবস্থায় দেখে আমি নিজে থেকেই ওর কাছাকাছি দাড়িয়ে আমার হাতে থাকা সেলফোনটা মিছে মিছে কানে ধরে বলেছিলাম- বাহ! সাদা রঙের শার্টের সাথে কালো ফ্রেমের চশমায় তোমায় তো বেশ ভালো লাগছে!
এরপর আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ও আমার দিকে কিছুটা এগিয়ে এসে বলেছিলো- গোলাপী কামিজের সাথে সাদা ওরনা, আর পিঠ বেয়ে ঢেউ খেলে যাওয়া মেঘকালো চুলের কোনো মেয়েকে খারাপ তো লাগার কথা না!
আমি কিছু বুঝে উঠতে না পেরে খানিকটা ঘাবড়ে যেয়ে বলেছিলাম, জ্বি, মানে, কিছু বললেন কি?
- বললাম, তোমার চোখগুলো অনেক সুন্দর, সুনয়না....
-ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না।
- তা, কোথায় যাওয়া হচ্ছে কৃষ্ণকেশী?
-বাবার সাথে দেখা করতে।
-নামটা কি জানতে পারি মিস সাইলেন্ট হার্ট কিলারের?
-মিস তো না ও হতে পারি!
-হলে তো সাদা শার্ট ভালো লাগতো না!
আমি সাধারনত কখনো কারো সাথে কথা বলতে ঘাবড়াই না। শেষ একবার ঘাবড়েছিলাম কলেজ প্রিন্সিপ্যালেরর ঝাড়ি খেয়ে। এছাড়া আমি বাবাকেও ভয় পাই না। তবে কেনো যেনো বুকের ভেতরের ধুকধুক আওয়াজটা পুরো ফেরীর মানুষ শুনতে পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আচ্ছা, আমি ওর সাথে কথা বলতে ঘাবড়ে কেনো যাচ্ছি!!
- এই যে মিস ভাবনা দেবী, নামটাই তো জানা হলো না!
ভাবনায় ছেদ ঘটলো আমার বটে, তবে বুকের ধুকধুকটা কমছেই না যেনো!
-জ্বী, বনলতা।
-বেণু বলে ডাকতে পারি, তবে একটা শর্ত আছে।
-জ্বী, মানে, বুঝলাম না।
- শোনো মেয়ে, তুমি আমায় মাহফুজ বলে ডাকবে, আর আমি তোমায় বেণু। মনে থাকবে?
আমি চুপচাপ মাথা নাড়লাম। হালকা বাতাসের দমকায় আমার কানের পেছনে থাকা চুলগুলো চোখমুখে এসে পড়লো। আমি আমার কনিষ্ঠা আঙ্গুলটা দিয়ে সরানোর প্রস্তুতি নিতেই মাহফুজ হাতটা ধরে ফেলে বললো- থাক না ওটা, ভালোই লাগছে। সারাজীবন ঐ চুলগুলো সরানোর দায়িত্ব টা আমায় দেবে বেণু?? আর কিছুই চাইবো না তোমার কাছে।
আমি কিছুই বলতে পারছিলাম না। কথাগুলো কন্ঠনালী পর্যন্ত এসে আটকে যাচ্ছিলো।
হঠাত্ ই লক্ষ করলাম ও বলছে- কখনোই ছেড়ে যাবো না তোমায়, কথা দিলাম!
কিন্তু ও এই কথা কেনো বলেছিলো তা আজ পর্যন্ত কোনো সমাধান পাঠাতে পারেনি মস্তিকে!
আমি একা একা ফেরীর একটা কনায় দাড়িয়ে ভাবছিলাম কথাগুলো। ভাবতে ভাবতে কখন যে দু চোখে জলপ্রপাত শুরু হয়ে গিয়েছে বুঝতেই পারিনি।
দুর থেকে আজানের সুমধুর শব্দ ভেসে আসছে।
ঠিক এইরকম কোনো একটা সময় মাহফুজ বলেছিলো- বেণু, আমায় ক্ষমা করে দিয়ো, "তোমায় দেয়া কথা আমি রাখতে পারবো না। আমার বাবাকে দেয়া কথা রাখতে যেয়ে বাধ্য হয়ে আমি রিক্তা কে বিয়ে করবো কাল।"
কথাগুলো শুনে আমি পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো লাভ ছিলো না বলে আমি শেষটায় বলেছিলাম-
"শোনো, নিজের খেয়াল রেখো, আর ওকে কখনো কষ্ট দিয়ো না... চোখের পানিটা মুছে অনেকটা কষ্ট করে শেষ কথাটা বলেছিলাম- মেয়ের নাম কিন্তু ইচ্ছে ই রেখো।"
কথাটা বলেই ফোনটা কেটে দিয়ে ইনহেলারটা খোঁজা শুরু করলাম.....
আজ প্রায় চারবছর পর আমি গাঁয়ের পানে পা বাড়ালাম। বাড়িটা পাক্কা আগের মতোই আছে। আমি দেরী না করে উত্তর দিকে যেয়ে দেখলাম কৃষ্ণচূড়া গাছটা এখনো আছে। সাথে মায়ের থাকার স্থানটাও!
ভেতরে যেয়ে হুইলচেয়ারে বাবাকে দেখে হুহু করে কেঁদে ফেললাম। বাবাও এই প্রথম কাঁদলো আমার সামনে।
রাত প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে আমি কড়িডোরে পায়চারী করছিলাম। হঠাত কিসের যেনো একটা আওয়াজ পেলাম, কিছু পরে যাবার হয়তো।
পেছনে তাকিয়ে দেখলাম বাবা।
-জানিস মা! তুই একেবারেই তোর মায়ের মতো হয়েছিস।
-যেমন?
-এই তো চাপা স্বভাবের!
-কি বলো বাবা?
-আমার মা ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর আমি বুঝতে পারবো না! তবে কেমন বাবা হলাম আমি?
-না বাবা, তেমন কিছু না।
-মা রে, ছেলেটা ভালো, পরিবারও ভালো, ভালো চাকুরীও করে।
-বাবা, আমি একা সত্যিই ভালো আছি!
আমি একটু কৃত্রিম হাসি দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় মগ্ন হলাম।
- তোকে দেখে আবারও বুঝলাম মা, না পাওয়ার মধ্যেও সর্বোচ্চ সুখ লুকিয়ে থাকে। আজ তোর মায়ের ২৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী।
কথাটা বলেই হুইলচেয়ারটা ঘুরিয়ে বাবা রুমে চলে গেলো।
হালকা আধারের ফলে আমার চোখে ধরা না পরলেও আমি লিখে দিতে পারি এ সময়টা বাবার চোখ থেকে টপ টপ করে অশ্রু ঝরছিলো। এ শব্দ আমি হৃদপিন্ড দিয়ে শুনতে পাই। এ অশ্রুর নামটা আমার জানা নেই। মাহফুজ থাকলে হয়তোবা বলে দিতে পারতো!
ভোর পাঁচটা বেজে এগারো মিনিট। আলো আধারির খেলা চলছে জানালার ওপাশে। এ খেলাতে আধারই এগিয়ে আছে।
আমি আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাম। হাতের ডানপাশে থাকা ছেড়া ডায়েরীটা হাতে নিলাম। আজ আমাদের প্রথম দেখার পাঁচ বছর পূর্নতা পেলো। আমি ডায়েরীটার ভেতর থেকে রঙের টেক্কাটা হাতে নিয়ে নিরবে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।
কেননা, এটাই তো আমার একমাত্র শেষ স্মৃতি মাহফুজের দেয়া। তা ও আবার এটা দিয়ে প্রোপোজ করেছিলো কি না!
ড্রেসিংটেবিল এর ওপর অগোছালো পরে থাকা সাদা ওড়নাটা হাতে নিয়ে ছাদের দিকে পা বাড়ালাম। আমি জানি অতীতরা খুব খারাপ হয়। বুকের ভেতরটা শেষ করে দেয় প্রতি মুহুর্তে!
আমি চোখ কচলাতে কচলাতে ছাদে উঠে দাড়াতেই চোখজোড়া আমার ছানাবড়া হয়ে গেলো!
এত্তো ফানুস! আগে কখোনো দেখিনি এতো ফানুস একসাথে।
আশে পাশে চোখ বুলাতেই পায়ের কাছে একটা নীল কাগজ চোখে পড়লো। কাগজটা হাতে তুলতেই আমি নিশ্চিত হলাম হাতের লেখাটা মাহফুজের। কিন্তু ওর লেখা এখানে কীভাবে আসবে! আজব তো!
কাগজটা হাতে নিয়ে ভাঁজ খুলতেই লেখা দেখলাম-
'প্রিয় এলোকেশী,
যদি আমাদের জীবনে অতীত বলে কিছু না থাকে, তবে কি বড্ড বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে? ইচ্ছে যখন পৃথিবীতে আসে তখন ওর মা চলে যাবার সময় বলেছিলো, আমার মেয়েটা যেনো বেণুর মেয়ে হয়েই বড় হয়। বাচ্চাটা জন্মের পর থেকেই তোমায় মা বলে জানে। এর পরেও কি ফিরিয়ে দেবে তোমার চাশমিশ কে? উত্তরটা না হয় সামনে থেকেই দিয়ো!
ইতি-
তোমার মাহফুজ।'
আমার কয়েক মূহুর্ত সময় লাগলো বুঝতে যে, আমার সাথে কি ঘটছে। স্বপ্ন না হয় হ্যালোসিনেশন কিছু একটা হবে ভেবে সিড়ি বেয়ে নিচের দিকে যাবো ভাবছি, ঠিক এমন সময় হঠাত্ করে ধুমকেতুর মতো আমার সামনে এসে দাড়ালো মাহফুজ!
আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না কি হচ্ছে, বা হতে চলেছে।
মাহফুজ আমার দিকে একটা রঙের টেক্কা আর কিছু কালো গোলাপ এগিয়ে দিয়ে কিছুটা ফিল্মি স্টাইলে হাটু গেড়ে বসে বললো-
বলবো না ফিরিয়ে দিয়ো না, শুধুু বলতে চাই, মন থেকে তোমাকেই ভালোবাসি,কিন্তু এটার জন্য তুমি আমায় গ্রহন করবা এমনটা না। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার ইচ্ছে মা'টার জন্য একটা মা খুব প্রয়োজন। তাছাড়া তুমি জানোই তো, ইচ্ছের মা অন্য কেউ হতে পারে না!
আমি ঠিক এখনো বুঝতে পারছি না কি ঘটছে এসব। হঠাত্ একটা তিন বছরের ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে শুরু করলো আর বলতে থাকলো- তুমি অনেক পঁচা আম্মু, আমার কাছে থাকো না! আমার কাছে আসো না!
এতোখনে আমার কাছে সব কিছুই উঠন্ত সূর্যটার মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো। আমি বাচ্চাটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছি। ছাড়বো না কখনো, কখনোই না, এমন কি মাহফুজ চাইলেও না। ও শুধু আমার মেয়ে, আমার ইচ্ছে মা!!
মা'টার কান্নার শব্দে যেনো বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া মৃতপ্রায় নদীটাও হাসছে, শব্দ করে হাসছে! একটা মা খুঁজে পাওয়ার আনন্দে হাসছে!!
অবশেষে বুঝতে পারলাম চিটারটা আমার সাথে চিটারিই করেছে! গোলাপ গুলো আসল কালো গোলাপ ছিলোই না! তা তে কি এসে যায়? রঙের টেক্কাটা তো আসল ই ছিলো!!


লামিয়া হোসেন বনলতা

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.