বেলীফুল

বেলীফুল

ব্যালকনিতে পাত্র পাত্রীকে আলাদাভাবে কথা বলতে দেয়া হয়েছে, রুমের ভিতরে আর সবাই বসে আছে ; তাই খুব ফিসফিস করে পাত্রী নিপুন বললো
- আপনি আমার উপকার করুন প্লিজ,আমার একজনের সাথে রিলেশন চলছে তাই আপনি শুধু বলবেন আমাকে আপনার পছন্দ হয় নি ; আমার রিলেশন এর কথা জানাবেন না প্লিজ।
হাসি দিয়ে পাত্র মুহিব বলে - বিয়ে তো আমি আপনাকেই করবো।
- আপনি মনে হয় বুঝতে পারছেন না - আমি গত চার বছর ধরে একজনের সাথে প্রেম করছি।
- এখানে তো আমার কিছুই করার নেই, আপনার মতো সুন্দরীর প্রেম থাকতেই পারে কিন্তু আমি তো প্রেমিক হতে আসি নি - আমি হবো আপনার বর।
এইবার কিছুটা রাগত স্বরে নিপুন বললো - আমি বুঝতেই পারছিনা - আপনাকে এতো ক্লিয়ার করে বলছি তারপরেও কেন আমাকেই বিয়ে করতে চাইছেন?
-আমি নিরুপায় - আপনার ছবি দেখেই মনে হলো - এক অদৃশ্য মায়াজালে আমি আটকে গেছি - এই মায়াজাল ছিন্ন করার উপায় আমার জানা নেই।
- আপনার চেয়ে আরও জটিল মায়াজালে আমি আবদ্ধ তাই বলছি এমন বিয়েতে আপনি কখনো সুখী হবে না।
- সুখ নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, আপনাকে পাশে পেলেই সুখকে পাওয়া হয়ে যাবে আমার।
রুমের ভিতর থেকে আড়চোখে সবাই আমাদের দিকে তাকাচ্ছে - বেশী কথা বলতে পারছি না। আমার মোবাইল নাম্বারটা রাখুন পরে আপনাকে আমি সব বুঝিয়ে বলবো -বলেই নিপুন ড্র‍য়িং রুম পেরিয়ে নিজের রুমে চলে যায়।
মুহিব ব্যালকনিতে থেকেই তার ছোট বোন মিলাকে ডাকে - দুই ভাই বোন কিছু কথা বলে ভিতরে এসেই মিলা বলে - আমাদের সবার মতো ভাইয়ারও পাত্রী খুব পছন্দ হয়েছে।
তখন নিপুনের ভাবী বলে - আচ্ছা আপনারা বসেন - আমি নিপুনের সাথে ভিতরের রুম থেকে কথা বলে আসছি, ভাবীকে দেখতে পেয়ে নিপুন বলে - ভাবী ছেলে আমার একদম পছন্দ হয় নাই - এইরকম মেয়েদের মতো ফর্সা ছেলে আমার কখনোই ভালো লাগে না।
- নিপুন তোর মতলবটা কি ঠিক করে বল! তুই কি এখনো সেই আঁধারের আলোর অপেক্ষা করে বসে আছিস? যে ছেলে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর ভয়ে চার বছরের সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলে তার কথা তুই আমাকে আর বলবি না ; গত পাঁচটা মাস বাবা আর তোর ভাইকে কত কিছু বুঝিয়ে সব বিয়ে ফেরত পাঠিয়েছি শুধু তুই বলেছিস - ওই আধাঁরের আলো আসবে ; কিন্তু এইবার তারা আর আমার কোন কথাই শুনবেন না সাফ জানিয়ে দিয়েছে ; আমি বুঝি না কেন যে এইসব ফেইক আইডির সাথে প্রেম করতে গেলি - এখন তো বুঝলি মানুষটাও যে ফেইক ; তোর ওই আঁধারের আলো নিজেই আঁধার হয়ে বসে আছে।
- ভাবী - আমার আইডিটাও তো ফেইক ছিলো, মেঘের দেশের রাজকন্যা ; আর অনন্ত তো ফেইক না - তুমি তো জানো আমরা চার বছরের রিলেশনে তিনবার দেখাও করেছি ; অনন্ত আমার হাতটাও এই তিনবারে ধরতে চায়নি ; আমিও তো বুঝতে পারলাম না - শুধু বললাম - অনন্ত আগামীকাল আমাদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে এরপর থেকেই তার আইডি ডিএক্টিভেট আর মোবাইল নাম্বারও বন্ধ।
- কি প্রেম করিস যে - বাসার ঠিকানাটাও নিল না! বাসার ঠিকানা নিলেও তো এখন বাসায় গিয়ে খোঁজ নেয়া যেতো। এখন বাদ দে - যা হয়েছে ভালোর জন্যই হয়েছে ; চল মুহিবের তোকে খুব পছন্দ হয়েছে ; তুই আর দ্বিমত করিস না।
- ভাবী - আমার তো পছন্দ হয় নাই আর অনন্তের জায়গায় অন্য কাউকে আমি বসাতে পারবো না।
আচ্ছা - আপাতত বিয়ের পিঁড়িতে বস ; চল।
কেমন একটা ঘোর লাগা পরিবেশে নিপুনের আংটি বদল হয়ে যায় - এক সপ্তাহ পরেই বিয়ের তারিখ করা হয়। তবে নিপুন বুঝতেই পারে না - নাম্বারটা দেবার পরেও মুহিব একবারের জন্যও কল দেয় না কেন! নিপুন খালি চেক করে ফেসবুকে আঁধারের আলো আর অনন্ত নামের হাজার হাজার আইডি কিন্তু কোনটাতেই তার অনন্তকে খুঁজে পায় না - দুই দিন পর বিয়ে - আত্নীয় স্বজনে পুরো বাসা গমগম করছে আর নিপুনের একটু পর পরেই অনন্তের কথা ভেবে চোখ থেকে পানি ঝরছে ; সবাই ভাবছে মা মরা মেয়ে বাবা - ভাই আর ভাবীকে ছেড়ে পরের বাড়িতে চলে যাবে তাই হয়তো মেয়েটার এতো কান্না আসছে।
বিয়ের দিন নিপুন একবারের জন্যও তার মাথাটা তুলে তার ফর্সা বর মুহিবকে দেখে নাই। বাবা যখন নিপুনের হাতটা মুহিবের হাতে তুলে দেন তখন নিপুন দেখে মুহিবের হাত তেমন ফর্সা নয়।
গাড়িতে করে বরের পাশে বসে শশুড়বাড়ির দিকে বাবা ভাই আর ভাবীর মুখগুলো ভেসে ওঠে আর চোখ গড়িয়ে অশ্রুবিন্দু ঝরতে থাকে ; গাড়ির গ্লাসের ওপারে হারিয়ে যেতে থাকে তার চিরচেনা পরিবেশ আর সেগুলো দেখতে দেখতেই শশুড় বাড়িতে এসে পড়ে।
মুহিবের বোন মিলা নিপুনকে ফুল দিয়ে ঘেরা রুমের ভিতরে নিয়ে আসে আর বলে -এই হলো তোমাদের রুম ; তোমার লাগেজটা ওই যে ড্রেসিং টেবিলের পাশেই আছে - তুমি এখন ফ্রেশ হয়ে নাও ; আমি আসছি ভাবী।
নিপুন শাওয়ার নিয়ে ভেজা চুল মুছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই দেখে - টেবিলটার উপর বেলী ফুলের মালা কিন্তু যখন মুহিবের বোন লাগেজটা দেখাচ্ছিলো তখনও বেলী ফুলের মালাটা ছিলো না ; তবে কি কেউ রেখে গেছে কিন্তু নিপুনের বেলী ফুল পছন্দ সেটা তো শুধু অনন্ত জানতো। যে তিনবার তারা দেখা করেছে অনন্ত নিপুনের জন্য তিনবারেই বেলী ফুলের মালা নিয়ে এসেছে - মালাটা নিয়েই নিপুন মাথায় গুঁজে দিতো - মুগ্ধ হয়ে অনন্ত দেখতো - তৃতীয়বার দেখা করার সময় বলেই ফেললো - আফসোস বেলী ফুল হতে পারলাম না - তাহলে তো মালা হয়ে তোমার ঘাড়ে মাথা রাখতে পারতাম!
লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিপুন প্রসংগ পাল্টাতে চাইলো তাই বললো - চলো কিছু খাই - খুব ক্ষিধে পেয়েছে।
এইসব ভেবেই নিপুন মাথা নিচু করে ভেজা চুলগুলো এক পাশে সরিয়ে বেলী ফুলের মালাটা মাথায় গুঁজে আয়নায় তাকাতেই অতিমাত্রায় বিস্মিত হয়ে গেলো ; আয়না থেকে চোখ সরিয়ে ঘুরে বললো - অনন্ত তুমি! এখানে কিভাবে আসলে? এতদিন কোথায় ছিলে?
আরও কিছু বলতে চাইছিলো কিন্তু অনন্ত থামিয়ে দিয়ে বললো - ওরে পাগলী বিয়ের সময় নিজের বরের মুখটাও দেখলে না! মুহিব আমার কাজিন - তোমার পরিবার আর আমার পরিবার সবাই মিলে এই নাটকটা করেছি - না হলে বুড়োকালে পান চিবুতে চিবুতে কি গল্প করবে আমাদের নাতি - নাতনীদের কাছে!
- তোমাকে আমি খুন করবো শয়তান বলেই অনন্তকে জড়িয় ধরে
নিপুনের মাথার বেলী ফুলটা খুলতে খুলতে অনন্ত বলে - খুনটা না হয় কাল সকালেই করো।


কলি ফাহমিদা

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.