মেহমান
মেহমান
অনেকদিন পর আজ আমাদের বাড়িতে মেহমান আসবে।আজ তো আমি বেজায় খুশি।মেহমান আসা মানেই মজা।মেহমান আসবে তাই স্কুলেও যাইনি। বাবা বলল,আবির আজকে স্কুলে যা তুই ফাইভে পড়িস এবছর ভালো রেজাল্ট করতে হবে।আমি মাথা নেড়ে বললাম,না বাবা আজকে যাব না।
আজকে কি যেন মনে করে বাবা জোর করল না।হয়ত মেহমান আসবে তাই একটু কাজ টাজ করতে হবে।যাই হোক স্কুলে না যেতে পারলেই ভালো।এদিকে মা ব্যস্ত।সকাল থেকেই একাজ ওকাজ করেই যাচ্ছে। বাবা প্রতিবারের মতো আমাকে নিয়ে বাজারে গেলেন।একটা বড় রুই মাছ,এক কেজি চিংড়ি। আহা বড় বড় চিংড়ি। মা চিংড়ি ভুনা করে রাঁধবে। এটা ভেবেই জিভে জল এসে গেল।এরপর বাবা অনেকপ্রকার সবজি কিনল।তারপর গেল মুরগির দোকানে।আমি বাবাকে বললাম সাদা মুরগি কিনতে। বাবা আমাকে পাত্তা না দিয়ে দোকানদারকে বলল, ভাই দেশি মুরগির কেজি কতো??দোকানদার দাম বলার পর বাবা তিনকেজি মুরগি দিতে বলে।আমার দিকে তাকিয়ে বাবা হাসি দিয়ে বলল,আরে বাবা ফার্মের মুরগি সবাই খায় না।আমি কিছু বললাম না।
বাজার থেকে বের হতে যাব এমন সময় বাবা বিরক্তিকর স্বরে বলে উঠল, ওহ হো আসল জিনিসই তো কিনলাম না।গরুর মাংস ছাড়া কি কিছু হবে!!
আসলেই তো আমার প্রিয় খাবারই কিনল না।গরুরু মাংসের ভুনা ছাড়া কি নিমন্ত্রণের খাবার জমে??? বাবা দুই কেজি গরুর মাংস কিনল।কসাই মাংসের বড় পিস কোপাতে কোপাতে বলল,ভাই এক্কেবারে সিনার মাংস পাইচেন ঠকেন নাইক্কা।মাংস নিয়ে বাবা পকেট থেকে চকচকে এক হাজার টাকার নোট বের করে কসাইকে দিল।ইস এই টাকা যদি আমাকে দিত তাহলে স্কুলে সবার থেকে দামি খাবার কিনে খেতে পারতাম প্রতিদিন।বাজার থেকে বের হওয়ার সময় বাবার কাছে আইসক্রিম খাওয়ার আবদার করলাম।বাহ বাবা একটা কোণ আইসক্রিম কিনে দিল।বাবার মনে হয় টাকা পয়সা বেড়ে গেছে।অন্যদিন তো আইসক্রিমের কথা বললে ধমকের স্বরে বলত,এগুলা খেলে ঠান্ডা লাগবে।যাক আজকে খুশি মনে কিনে দিল।
পুরো বোঝাই করা দুই ব্যাগ বাজার নিয়ে রিকশায় উঠলাম বাবা ছেলে।
বাসায় মেহমান আসলে আমার চেয়ে মনে হয় কেউ বেশি খুশি হয় না।কারন মেহমান আসা মানে ভালো ভালো খাবার।আর মিষ্টি, ফল,চিপস খাওয়ার আনন্দ তো আছেই।বাবা রিক্সাতে আমার দিকে একদৃস্টে তাকিয়ে আছে।একটু পর হয়ত বলবে,বাবা ভালো করে পড়াশোনা করিস।নাহ এখনো তাকিয়ে আছে।কয়েকশ সেকেন্ড পার হলো। যাক বাবা বাচা গেল পড়াশোনার কথা আজ বলল না।একি বাবা এখনো তাকিয়ে আছে এবার আমার একটু লজ্জা লাগতে শুরু করছে।রিক্সা বাড়ির সামনে এসে গেছে।আমি একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে ঘরের দিকে যাচ্ছি। উফ কি ভারি। দুই হাত দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছি। মা এসে আমাকে সাহায্য করল।রান্না ঘরে গিয়ে সব কিছু বের করল।এর মধ্যে বাবা এসে প্রবেশ করল।মা তীক্ষ্ণ নজরে সবকিছু দেখছে আর বাবার কাছে দাম জিজ্ঞেস করছে।মা বাবাকে বলল,বাজার আরো কম করে আনলে ভালো হতো না??
-আরে ওরা কি সবসময় আমাদের বাড়িতে আসবে নাকি?? এই প্রথমই ওরা আসবে।(বাবা)
-আচ্ছা থাক। তারপরও তো মাসের শেষদিকে..........
-আচ্ছা মা আজকে কারা আসবে??
-আসলেই দেখবি(মা)
-শরবত আর আরসি আনেন নাই??(মা)
-ওহ হো ভুলেই গেছি।আবির তুই মনে করিয়ে দিবি না??
বাবা পকেট থেকে ১০০ টাকার একটা নোট আর সাথে খুচরা ৫০টাকা দিয়ে বলল,দোকান থেকে ট্যাং আর ২লিটার সেভেন আপ নিয়ে আয় ডেট দেখে আনিস।আমি দোকান থেকে এগুলো নিয়ে এসে টিভি দেখতে বসে গেলাম।অনেকক্ষন ধরে টিভি দেখছি।ভালো লাগছে না।বাবা ডিশ লাইনটা বন্ধ করে দিয়েছে শুধু বিটিভি দেখতে ভালো লাগে না।বড় ভাইয়া আর আপু স্কুল থেকে চলে আসছে।আজকে আগেই ছুটি হয়ে গেছে।আপুকে দেখেই বললাম,আপু আপু আজকে মেহমান আসবে।আপু কাঁধ থেকে ব্যাগ রেখে বলল,কারা আসবে রে??
আম্মুর মতো করে বললাম,আসলেই দেখবা।এরমাঝে আবার আম্মু হাকঁ দিয়ে বলল,আসিফ তোর আপুকে বল তো ঘরটা ঝাড়ু দিয়ে বিছানা গোছাতে।আপু ফ্রেশ হয়ে কাজে লেগে পড়ল।আমি আস্তে আস্তে রান্না ঘরে গিয়ে সুরে সুরে বললাম,মাঅাঅা...
-কি হয়েছে??
-দেখি তো তোমার তরকারিতে লবণ হয়েছে নাকি।
-ও বুঝতে পারছি।
মা আগুনে বসানো পাতিল থেকে এক টুকরো মুরগির মাংস তুলে দিল।আমি আরেক টুকরো চাইলাম।মা প্রথমে দিতে চায়নি পরে দিয়েছে।আহ!!রান্না ঘরের ঘ্রাণটাই আজ আলাদা।মুরগি,গরুর মাংসের একটু ঝাঁঝালো ঘ্রাণ এসে বারবার নাকে লাগছে।মাংস প্লেটে নিয়ে টিভির রুমে গিয়ে বসলাম।দেখি ভাইয়া বসে আছে।ভাইয়া আমার প্লেট থেকে বড় মাংসের টুকরো তুলে নিল।এহ আমি এতো কষ্ট করে আনলাম আর ও খেয়ে ফেলল।চোখ বড় বড় করে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আছি।ভাইয়া খাচ্ছে আর হাসছে।আমি আবার রান্না ঘরে গিয়ে মাকে ভাইয়ার নামে বিচার দিয়ে আরেক টুকরো মাংস চাইলাম
-না বাবা মেহমান আসলে খাবে।
-না আমাকে এখন দেও
মা আর আমার সাথে বেশিক্ষন পারল না। শেষে দিতেই হলো।
এবার ভাইয়ার কাছে ধারে না গিয়ে মজা করে মাংসগুলো খেয়ে নিলাম।১০ কি ১৫ মিনিট পর কানে ভেসে এলো টিট টিট শব্দ।গাড়ির শব্দ।একি আমাদের ছোট্ট বাসার সামনে গাড়িটা থেমেছে।তারমানে মেহমান এসেছে গাড়ি নিয়ে।বড়লোক মেহমান।অনেক কিছু এনেছে মনে হয়।আসলেই অনেক কিছু এনেছে।আমার মেহমানের দিকে খেয়াল নেই খেয়াল তাদের সাথে আসা বড় বড় প্যাকেটগুলোর দিকে।সাথে অনেকগুলো মিস্টির প্যাকেটের দিকে আড়চোখে দেখলাম মাত্র দুজন এসেছে একজন লোক আর একজন মহিলা।প্যাকেটগুলো ঘরে নিয়ে যাওয়ার পর প্যাকেট খুলে খুলে দেখছি।কতো ধরনের ফল,বিস্কিট,চানাচুর,চকলেট,চিপস,জুস,কয়েকপ্রকার মিস্টি।মিস্টির প্যাকেট খুলে কয়েকটা মিস্টি খেয়ে ফেললাম।এরকম মিষ্টি কখনো খাইনি।অনেক মজা।মেহমান আসার পর বাবা মায়ের সাথে কথা বলছে।মহিলা আমাকে জিজ্ঞেস করল,বাবা তোমার নাম??
-আবির,
-বাহ অনেক সুন্দর না।তুমি বাবা আজকে আমাদে.......
-আন্টি আপনারা মাত্র দুজন এসেছেন কেনো?? আর কেউ নাই কেনো??
মহিলাটা একটু হাসল।
দুপুরে সবাই মিলে একসাথে খেলাম।আমার সবপ্রিয় প্রিয় খাবার।মন দিয়ে খাচ্ছি।খেয়ে পেটটা ড্রাম বানিয়ে ফেলেছি।বিকেলে মেহমানদের নাস্তা দিল মা।নাস্তা খেয়ে মেহমানরা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।একি মা এখনো বলছে না কেনো,ভাবি কষ্ট দিলাম,আবার আসবেন।নাহ আজকে দেখি বলছেই না।মায়ের দেরি দেখে আমার আর তর সইছে না আমি বলেই ফেললাম,ভাবি কষ্ট দিলাম।সবাই হেসে ফেলল।মহিলা তো হাসতে হাসতে প্রায় পড়ে যাচ্ছে। আচ্ছা তারা চলে যাচ্ছে সবার মতো আমাকে চকচকে নোটের টাকা দিচ্ছে না কেনো এ ভেবে আমার মন খারাপ হয়ে গেল।লোকটা বাবাকে বলল,ভাই একটু তাড়াতাড়ি করুন।মা লোকটার কথা শুনে মা আমাকে ভিতরের রুমে নিয়ে যায়। আমার জামা কাপড় বদলে দেয়।শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে মা বলল,বাবা আমার লক্ষী তুই মন খারাপ করিস না।তুই মেহমানদের সাথে তাদের বাড়ি যাবি
-ভালোই তো হলো ঘুরে আসতে পারব।
-না বাবা এখন থেকে তোকে ওদের বাড়ি থাকতে হবে
আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না।
মা- তুমি তো দেখোই তোমার বাবা কতো কষ্ট করে সংসার চালায়।তোমার বাবার কতো কষ্ট হয়।দেখ বাবা,ওরা অনেক বড়লোক তোমাকে অনেক আদর করবে।অনেক ভালো ভালো খাওয়াবে।ওদের অনেক বড় বাড়ি।তাদের কোনো ছেলে মেয়ে নেই তোমাকে নিজের ছেলের মতো রাখবে।
কথাগুললো বলতে বলতে মায়ের চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।আমিও কান্না করতে লাগলাম।কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলাম,মা আমি যাব না আমি তোমাদের সাথে থাকব।মা আমার কপালে চুমু দিয়ে বলে,এমন করে না বাবা লক্ষী আমার,আমরা তো তোমাকে কয়েকদিন পরপর দেখতে যাব তুমিও আসবা আমাদের দেখতে।মা আমাকে প্রায় জোর করে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল। সাথে একটা ব্যাগ দিল।আমাকে তারা গাড়িতে উঠাতে যাবে তারমাঝে বাবা আমাকে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।আপু আমার দিকে চেয়ে চেয়ে কাঁদছে। ভাইয়া রাগ করে দাঁড়িয়ে আছে।সবাই আমাকে দিল।মাকে আবারো জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম।আমাকে তারা জোর করে গাড়িতে উঠিয়ে দরজা আটকে দিল।গাড়ির গ্লাস দিতে সবার দিকে তাকিয়ে আছি।মাও একদৃস্টে তাকিয়ে আছে আমার দিকে হয়ত আমাকে এখন দেখতে পারছে না।গাড়ি চলতে লাগল।গাড়ি যাচ্ছে আর আমি গ্লাস দিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে আছি।মা গাড়ির পিছে পিছে আসছে আর চোখের পানি মুছছে।গাড়ি যেতে যেতে আর মা,বাবা,আপু আর ভাইয়াকে দেখতে পেলাম না।আমার চোখ দিয়ে স্রোতের মত পানি পড়ছে। আমি আজ থেকে বাবা মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেলাম? এই অপরিচিত মানুষদের সাথে থাকতে হবে।মা,আমি মেহমান হয়ে আমাদের বাড়িতে আসতে চাই না মা আমি তোমাদের ছেলে হয়ে অন্য কারো বাড়ির মেহমান হতে চাই।
সাহিদ ইসলাম

কোন মন্তব্য নেই