সেই মেয়েটা মোটা ছিলো
সেই মেয়েটা মোটা ছিলো
১
-তোমার ওজন সত্যিই খুব বেশি হয়ে গেছে।এবার তো একটু সিরিয়াস হও?আমি তোমাকে ৬ মাস সময় দিলাম। এই ৬ মাসের মধ্যে ওজন ৪৫ কেজিতে আনবা।নয়তো...
-নয়তো কি?
-কিছু না
-কিছু না মানে কি? বলো, নয়তো কি করবা?
- ব্রেকআপ,আন্ডারস্ট্যান্ড?
- কেন? (শান্ত হয়ে)
- এত মোটা মেয়েকে বউ হিসেবে মেনে নেয়া যায় না।আয়নায় নিজেকে দেখেছো কখনো?আমার সাথে তুমি বড্ড বেমানান।
- এই কথাটা দুবছর আগে প্রপোজ করার সময় মনে ছিল না? আমিতো তখনও এমনই মোটা ছিলাম। তুমি তো আমাকে তখনই দেখেছিলে।তাহলে আজ এসব কথা উঠছে কেন?
- তখন আমি মোহে অন্ধ ছিলাম। অতকিছু ভাবিনি...
- তখন যেহেতু ভাবো নি,আজও আর ভাবতে হবে না।আমি মুক্তি দিলাম তোমায়।ভালো থেকো,অন্য কারো সাথে।
- থ্যাংকস (মনে মনেঃ বাবা,বাঁচলাম!)
অতঃপর নিহি মনে অনেক অভিমান ও কষ্ট নিয়ে তার ২ বছরের স্বপ্নকে মাটিচাপা দিয়ে অনিককে ব্লক করে দিলো।
.
২
.
২
আজ নিহির মন খুব খারাপ।মন খারাপ হলে তার মাথায় অদ্ভুত কিছু চিন্তা ঘোরে,যার কিছু কিছু মাঝে মাঝে বাস্তবায়িতও হয়ে যায়।এই অদ্ভুত চিন্তাগুলোর অংশীদার অবশ্য কেউ হয় না,এমনকি সে কাউকে তার এমন অদ্ভুত চিন্তাভাবনার কথা জানতেও দেয় না।যখন নিহি ছোট ছিলো,তখন মন খারাপ হলে সে মায়ের শাড়ি,চুড়ি নিয়ে সাজতে বসে যেতো। মায়ের নীল শাড়ি, নীল চুড়ি,চোখের কোণে একটু কাজল,আর হালকা লিপস্টিক। ব্যস,এতেই সে হয়ে উঠতো অপ্সরী!কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই রঙ-রূপ ক্রমশই হারিয়ে গিয়েছে।১৬ বছরের কিশোরী নিহি আর ২৬ বছরের যুবতী নিহির মাঝে আজ অনেক তফাৎ। সেই রূপ-লাবণ্য আর নেই,চেহারায় বয়সের ছাপ আজ স্পষ্ট।বয়স বাড়ার সাথে সাথে বেশ মুটিয়েও গিয়েছে।সেই কোমলতাও এখন আর নেই,যে কোমলতায় মুগ্ধ হতো হাজারো যুবক।সদ্য কৈশোরে পা দেয়া সেই নিহি,যে কিনা সারাক্ষণ আয়নার সামনে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার দেখতো,তার আজ আয়নার সামনে দাঁড়াতেও আর ইচ্ছে করে না।নিজের বুড়িয়ে যাওয়া দেখতে কার আর ভালো লাগে?তাই আজ মন ভালো করার পদ্ধতিও চেঞ্জ হয়ে গেছে।
এখন তার মন ভালো করার ওষুধ হলো মজার মজার খাবার,এডভেঞ্চার,টুকটাক লেখালেখি, বই পড়া আর অনিক।এমন অনেক দিন হয়েছে যে,অনেক দূরত্বের পথ সে একা একা হেঁটে এসেছে।সেই পথের গাছপালা,ঘরবাড়ি,মানুষ,চারাগাছের নার্সারী,পথের ধারের নালা,কোনো এক পথচারীর আধখাওয়া সিগারেট... কিছুই তার নজর এড়ায় নি।হেঁটে হেঁটে কর্মব্যস্ত এই শহর দেখতে দেখতে মন এমনিই ভালো হয়ে যায়।
অনিক বেশ হাঁপিয়ে গেছে।তারই বা কি দোষ? সবাই ই তো চায় তার জীবনসংগী দেখতে সুন্দর হোক।সে এমনিতেই চলে গেলে নিহির হয়তো এতটা খারাপ লাগতো না।কিন্তু সে তাকে মোটা বলেছে,আর এটাই এই মুহূর্তে নিহির মন খারাপের কারণ।
গুটি গুটি পায়ে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো নিহি।মন প্রচন্ড খারাপ।অনিক নেই,এখন তো আর এডভেঞ্চার করা সম্ভব না,আর বাকি রইলো খাওয়া।
-আম্মু,আজ বিরিয়ানি রান্না করবা?
- কেন?
-খেতে ইচ্ছে করছে,তাই।
কোনো কারণে মায়ের মেজাজ খারাপ হয়ে আছে।নিহির দিকে তাকিয়ে বললেন, "আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছিস? দিনে দিনে তো একটা হাতি হয়ে যাচ্ছিস।কোন ছেলে তোকে বিয়ে করবে শুনি?এতগুলো সম্বন্ধ এলো,মোটা বলে কেউ পছন্দ করে না।আর যারা পছন্দ করে,তাদের তুই রিজেক্ট করে দিস।এরকমভাবে আর কয়দিন চলবে শুনি? সারাজীবন কি আমার ঘাড়ে চেপে খাবি? বিরিয়ানি কেন,নে আমার মাথাটাই খা।"
.
৩
মায়ের কথায় প্রচন্ড কষ্ট পেয়ে নিহি এক দৌড়ে ছাদে চলে এলো।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আপনমনে বললো," আম্মুও আমাকে মোটা বললো! কেউ আমাকে ভালোবাসে না।আম্মুও না,অনিকও না।এই দুনিয়ায় আমাকে ভালোবাসার মত একটা মানুষও নাই।আমি আর এই দুনিয়ায় থাকবো না।"
.
৩
মায়ের কথায় প্রচন্ড কষ্ট পেয়ে নিহি এক দৌড়ে ছাদে চলে এলো।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আপনমনে বললো," আম্মুও আমাকে মোটা বললো! কেউ আমাকে ভালোবাসে না।আম্মুও না,অনিকও না।এই দুনিয়ায় আমাকে ভালোবাসার মত একটা মানুষও নাই।আমি আর এই দুনিয়ায় থাকবো না।"
সময়টা তখন সন্ধ্যার ক্রান্তিলগ্ন।চারিদিক ভালোই অন্ধকার।মৃদু বাতাস বইছে।সে বাতাস নিহির এলো চুলগুলো আরেকটু এলোমেলো করে দিয়ে গেছে।নিহি আকাশের দিকে নিস্পলক চেয়ে আছে।
আকাশে চাঁদের দেখা নেই,তারাদের সাথে আড়ি হয়েছে বুঝি?নিহি তারা গোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো।মাথার ওপরের আকাশটায় মোটে ৫ টা তারা মিটিমিটি করে জ্বলতে দেখা গেলো।বাকিগুলো কই? তাদেরও বুঝি আমার মতই মন খারাপ? তাই মুখ লুকিয়ে বসে আছে?
এই ভেবে নিহির মনটা আবারো খারাপ হয়ে গেলো। দূরে কতগুলো আলো জ্বলছে।কর্মব্যস্ত শহরের রাত্রিকালীন চঞ্চলতা বেশ মনোমুগ্ধকর হলেও তা এই মুহুর্তে নিহির মনকে ছুঁতে পারলো না।মন ভালো করার অনেক চেস্টা করেও যখন নিহি ব্যর্থ হলো,তখন তার মনে হলো," এ পৃথিবীর কিছুই যখন আর ভালো লাগছে না,সুতরাং এখানে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।এবার তবে যাওয়া যাক?"
.
৪
ছাদের রেলিং এর ওপর উঠে দুহাত দু'দিকে ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিহি।আর একটু এগোলেই ৫ তলা ছাদ থেকে একেবারে নিচে গিয়ে পড়বে সে।কি আশ্চর্য! তার এখন একটুও ভয় করছে না! অথচ দুদিন আগেও উচ্চতাভীতির জন্য এই ছাদের ওপর থেকে সে নিচে তাকাতে পারতো না।এখন তার নিজেকে মুক্ত পাখি মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে,ইচ্ছে করলেই যেন ওড়া যায়! আজ সে একদম স্বাধীন, কেউ কথা শোনানোর নেই,কেউ বকা দেয়ার নেই,মোটা বলারও কেউ নেই।
"এই যে এখন ৫ তলার ওপর থেকে লাফ দিব,তখন কি আর আমাকে কেউ মোটা বলতে পারবে?বলতে পারবে,এই তুই মোটা,লাফ দিস না,মাটি ব্যথা পাবে!
হা হা হা,কেউ বলতে পারবে না।বললে বলুক,শোনার জন্য তো আর আমি থাকবো না!"
এই ভেবে নিহির মনটা আবারো খারাপ হয়ে গেলো। দূরে কতগুলো আলো জ্বলছে।কর্মব্যস্ত শহরের রাত্রিকালীন চঞ্চলতা বেশ মনোমুগ্ধকর হলেও তা এই মুহুর্তে নিহির মনকে ছুঁতে পারলো না।মন ভালো করার অনেক চেস্টা করেও যখন নিহি ব্যর্থ হলো,তখন তার মনে হলো," এ পৃথিবীর কিছুই যখন আর ভালো লাগছে না,সুতরাং এখানে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।এবার তবে যাওয়া যাক?"
.
৪
ছাদের রেলিং এর ওপর উঠে দুহাত দু'দিকে ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিহি।আর একটু এগোলেই ৫ তলা ছাদ থেকে একেবারে নিচে গিয়ে পড়বে সে।কি আশ্চর্য! তার এখন একটুও ভয় করছে না! অথচ দুদিন আগেও উচ্চতাভীতির জন্য এই ছাদের ওপর থেকে সে নিচে তাকাতে পারতো না।এখন তার নিজেকে মুক্ত পাখি মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে,ইচ্ছে করলেই যেন ওড়া যায়! আজ সে একদম স্বাধীন, কেউ কথা শোনানোর নেই,কেউ বকা দেয়ার নেই,মোটা বলারও কেউ নেই।
"এই যে এখন ৫ তলার ওপর থেকে লাফ দিব,তখন কি আর আমাকে কেউ মোটা বলতে পারবে?বলতে পারবে,এই তুই মোটা,লাফ দিস না,মাটি ব্যথা পাবে!
হা হা হা,কেউ বলতে পারবে না।বললে বলুক,শোনার জন্য তো আর আমি থাকবো না!"
এই কথা ভেবে হঠাৎই নিহির অনেক আনন্দ অনুভূত হচ্ছে।কিছুক্ষণ ধরে সে মুচকি মুচকি হেসে চলেছে।আর তখনই হঠাত তার মনে পড়লো এরকম করে মুচকি হাসি তো তার প্রিয় বান্ধুবী হাসে।প্রিয় বান্ধুবীর কথা মনে পড়ায় একটু যেন মরার ইচ্ছেটা কমে গেলো।তারপর তার আবার মনে পড়লো,"আরে!গত সপ্তাহে মিশু আর নিশুর যে নোট খাতাগুলো এনেছিলাম,সেগুলো তো আমার কাছে! ওদের খাতা গুলো না দিয়ে মরলে তো ওদের কাছে ঋণ থেকে যাবে!"
মরার ইচ্ছেটা আরেকটুখানি কমে গেলো নিহির।
রেলিং এর ওপর দাঁড়িয়েই ভাবতে লাগলো নিহি,আর কারো কাছে তার কোনো ঋণ আছে কিনা...
মনে পড়ে গেলো,ক্যান্টিনের মামার যে এখনো ২ টাকা বাকি।
আরো মনে পড়লো,যে বুড়ো দাদু ওভারব্রীজের নিচে ভিক্ষে করেন,ভার্সিটি যাওয়ার পথে প্রতিদিন তাকে ৫ টাকা করে দেয় নিহি।দাদুর আগামীকালের ৫ টাকাও তো দেয়া বাকি।
মরার ইচ্ছেটা আরেকটুখানি কমে গেলো নিহির।
রেলিং এর ওপর দাঁড়িয়েই ভাবতে লাগলো নিহি,আর কারো কাছে তার কোনো ঋণ আছে কিনা...
মনে পড়ে গেলো,ক্যান্টিনের মামার যে এখনো ২ টাকা বাকি।
আরো মনে পড়লো,যে বুড়ো দাদু ওভারব্রীজের নিচে ভিক্ষে করেন,ভার্সিটি যাওয়ার পথে প্রতিদিন তাকে ৫ টাকা করে দেয় নিহি।দাদুর আগামীকালের ৫ টাকাও তো দেয়া বাকি।
এবার মরার ইচ্ছেটা যেন একটু দমে গেলো।ছাদের রেলিং থেকে নেমে এলো নিহি,কিন্তু চলে গেলো না।জীবনে আর কি কি করা বাকি সে হিসেব মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো সে।
"_আম্মু বকা দিলেও ঠিকই বিরিয়ানি রান্না করবে আজ।আমার তো এই বিরিয়ানি খাওয়া বাকি!
_একটু পরই অনিক কল দিয়ে সরি বলবে।আমার তো ওর সাথে ঝগড়া করা বাকি!আমাকে মোটা বলে,এত্ত সাহস ওর! 
_মাস্টার্স ফাইনাল না দিলাম? রেজাল্টটাও তো জানা বাকি!
_আম্মুর আমের আচারগুলা শেষ করা বাকি।আমাকে মোটা বলে? এটাই আম্মুর শাস্তি! 
_আমি মরে গেলে আমার নতুন জামাগুলো কে পরবে? আম্মু মানুষকে দিয়ে দিবে।এহহ,এত্ত কষ্ট করে কেনা জামা মানুষ পরবে? আমার তো এ জামাগুলোও পরা বাকি!
_আমার শখের বইগুলা...এগুলা তো আম্মু বিক্রি করে দিবে আমি না থাকলে।নাআআআআআ...আমার বইগুলা আগলে রাখা বাকি।
_আরে ধুর।এত কষ্ট করে এতগুলা বছর পড়াশুনা করলাম কি ঘোড়ার ঘাস কাটতে? ইনকাম করা তো এখনো বাকি।
_আম্মুর আদর খাওয়া এখনো অনেক বাকি..."
নাহ,এবার আর মরতে একদমই ইচ্ছে করছে না নিহির।বাসায় চলে যাবে এমন সময় হঠাৎই ফোন বেজে উঠলো।স্ক্রিনে ভেসে উঠলো,"He"
অনিক ফোন দিয়েছে।রিসিভ করে ফোন কানে ঠেকালো নিহি।কোনো কথা বলার আগেই অনিক বলে উঠলো,
অনিক ফোন দিয়েছে।রিসিভ করে ফোন কানে ঠেকালো নিহি।কোনো কথা বলার আগেই অনিক বলে উঠলো,
-সরি সোনা,ভেরি সরি।আমি আসলে ওরকম বলতে চাইনি।মাফ করে দাও প্লিজ।আর এরকম করবো না।সরি,সরি,সরি।
-আমার খারাপ সময়ে তুমি ছিলে না,এখন আর তোমাকে আমার দরকার নেই।তুমি যেতে পারো,প্লিজ।তুমি কোন সুপার মডেলকে বিয়ে করো,আমার যে সেটাও দেখা বাকি!
এ কথা বলেই ফোনটা কেটে দিলো নিহি।এখন তার আনন্দ হচ্ছে,পৈশাচিক আনন্দ! অপমানের যোগ্য জবাব দিতে পেরে আজ সে অনেক খুশি।অশ্রু মুছে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে মনে মনে বললো,"অত সহজে তোমায় আমি ছাড়ছি না সোনা...৬ মাসের যে এখনো অনেক বাকি!"
হুসনা


কোন মন্তব্য নেই