র্যাগিং এর প্রতিশোধ

র্যাগিং এর প্রতিশোধ
Image result for র্যাগিং এর প্রতিশোধ

সকাল থেকে শুয়ে আছি। দুপুর হতে আর অল্প কতক্ষণ।হঠাৎ বাবার চিল্লাচিল্লিতে উঠে বসে আছি।
এখনো রেডি হয়না কেন তোমার পোলায়? বলদের মত ঘুমের মধ্যে জাবর কাটে নাকি ও? আম্মাকে কথা শুনানো নিত্যদিনের অভ্যাস আমার বাবার। আম্মা যতটা না তার ভুলের জন্যে বকা শুনে তার চেয়েও বেশি শুনে আমার ভুলের জন্যে। ইদানিং আমার জন্যে খুব বেশি বকা শুনতে হয়। আমি বাসায় শুয়ে থাকলে বাবার কাছে মনে হয় যেন একটা গরু শুয়ে আছে আর জাবর কাটছে। আমার রুমের সামনেই এসে বাবার সেই অত্যাধুনিক বুলি শুরু করে দেয়। এর জন্যে আমি সম্পূর্ণ দোষী না। এতে বাবার দোষ ও আছে।
বাবা পয়ত্রিশ বছর বয়সে বিয়ে সেরেছেন।আমার তো সবেমাত্র সাতাশ বছর।এতেই বাবার সহ্য হচ্ছেনা। যে মানুষ টা পয়ত্রিশ বছর বয়সে বিয়ে করে ঠিক সেই মানুষটা কিভাবে তার সন্তানকে সাতাশ বছর বয়সে বিয়ের জন্যে চাপ দেয় তা আমার মাথায় ধরেনা।
যখন ইন্টারে থাকতে বাবার কাছে বিয়ের জন্যে পাত্রীর ছবিসহ গিয়েছিলাম তখন আমার জাত তুলে কয়েকটা গালি দিয়েছে। সেইদিন শুধু রাগ করিনি একটাই কারনে কারণ সব গালি বাবার গায়েই গিয়ে পড়ছে।
আজ সেই মেয়ের ক্লাস ওয়ানে পড়ুয়া একটা বাচ্চা আছে।প্রতিদিন বাসার সামনে দিয়ে যায়। এই কষ্ট তো বাবা বুঝেনা।
আমায় ইন্টারে থাকতে বিয়ে দিলে কি সুন্দর নাতনিকে আদর করতে করতে স্কুলে দিয়ে আসতে পারতো।
এসব ভাবতে ভাবতে ব্রাশ করা সেরে ফেললাম। বাবা রেডি হয়ে গেছে।কি সুন্দর পাঞ্জাবি পড়ছে।আম্মা তো রীতিমতো বাবাকে খোটা দিয়েই দিলো এই বলে যে, বেয়াইন সাহেবের সামনে যাওয়ার জন্যে কোনো মানুষ এত সেজেগুজে রেডি হয় তা আমার জানা ছিলোনা। বাবা এতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে মাথা আঁচড়াচ্ছিলো।
আমায় নিয়ে আবার চিল্লাচিল্লি শুরু করবে তাই তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বাবাকে বললাম
"চলো তাড়াতাড়ি চলো বাবার
কথাটা বলেই বাবার চোখের দিকে তাকাতেই দেখি তিনি রেগেমেগে আগুন হয়ে আছেন। কি হয়েছে তা জিজ্ঞেস করাতেই আমায় বললো
"বিয়ে তোর বাপ করবে নাকি তুই? আমি পড়েছি পাঞ্জাবি আর তুই চকচকে লাল শার্ট পড়েছিস কেনো?"
চুপচাপ রুমে গিয়ে নিজের উপর কয়েকটা গালি দিয়ে পাঞ্জাবি পড়ে মা কে নিয়ে সি এন জি তে উঠলাম।বাবা আগেই ফোনে কথা বলতে বলতে বের হয়ে অনেক দূরে চলে গেছেন। বাবাকে সাথে নিয়ে মেয়েদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মেয়ের বাবা আর আমার বাবার তো গভীর সম্পর্ক। দুইজন দুইজনকে দেখে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরছিলো যে আমার ছোটোবেলার বেষ্ট ফ্রেন্ড অনুপের কথা মনে পড়ে গেলো।অনুপকে স্কুলের মাঠে আমি এভাবে জড়িয়ে ধরার পর ওর শ্বাস নিতে কষ্ট
হয়ে যাচ্ছিলো।
বাসায় প্রবেশ করেই সবাইকে সালাম করে চুপচাপ সোফার এক কোণে বসে পড়লাম।অনেক আইটেমের খাবার সামনে রাখা আছে। খাবার দেখলে আমার জিহ্বাকে আমি সামলে রাখতে পারিনা। ভার্সিটির হলে থাকা অবস্থায় এই অভ্যাসটা বেশি আয়ত্ব করে ফেলেছি।সেই থেকে খাবার সামনে পেলে আমি অবচেতন মনেই গিলতে থাকি। এখানেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। কমলার টুকরা গুলো দেখে আমি সহ্য করতে পারিনি।লাল লাল প্রকোষ্ঠগুলো একটা একটা করে খেতে থাকলাম। বাবা ইশারায় যেন কি বলছে বুঝতে পারছিলাম না।আমি আমার খাওয়া চালিয়ে যেতে লাগলাম। হঠাৎ মেয়ের বাবা আমার বাবাকে বললো" সবার মনে হয় খিদে লাগছে।আমি ভাতের ব্যাবস্থাটা তাড়াতাড়ি করে আসছি" এই বলে তিনি বাসার ভিতরে চলে গেলেন।
আমার বাবা আমায় ধমক দিয়ে বিড়বিড় করে বললেন কমলা কি কখনো দেখস নাই? কেউ শুরু না করতেই তুই খাওয়া শুরু করে দিলি কেন?
আমার তখন হুশ আসলো যে আমি এতক্ষণ কি করে ফেলেছি।কিন্তু তাতে আমার প্রায়শ্চিত্ত করতে বাধা নেই কারন যা খাওয়ার আমি খেয়ে ফেলেছি।
একটু পরই মেয়ে আসলো।মেয়ের ঘোমটা খুলার পর আমার চোখমুখ কালো হয়ে আসছিলো।
এই মেয়েকে তো আমি ভার্সিটি ক্যাম্পাসে একবার র্যাগ দিয়েছিলাম।ওর নাম রিমু ছিলো। তাই রিমুর নামতা বলতে বলছিলাম ওকে। ওর তখন নামতা বলতে বলতে রিমু নামটা মুড়িতে রুপান্তর হয়ে যাওয়াতে আবার ওকে মুড়ির নামতা বলিয়ে রিমু নাম ঠিক করে দিয়েছিলাম।
সেইদিন আমার উপর ও যে পরিমাণ রেগে ছিলো সেই পরিমাণ রাগ আজ ওর চোখে দেখতে পেলাম না।তাই স্বস্তির ঢোক গিলে বিয়েতে হ্যাঁ সূচক জবাবে মাথা নাঁড়িয়ে দিলাম।
কিছুদিন পর
ধুমধাম করে বিয়ের কার্্য সম্পন্ন হলো। খুব খুশিতেই কাঁটতে লাগলো দিনগুলো। আমার স্ত্রীর আসল রূপ এখন আস্তে আস্তে টের পেলাম।
একজন নারী নাকি খুব সহজে তার অপমানের কথা ভুলেনা।সেটা আগে জানতাম।কিন্তু আস্তে আস্তে তার প্রমান পেতে লাগলাম রিমুর আচরণে।
সেদিন বাজার করতে পাঠালো।অনেক বড় লিষ্ট হাতে দিয়েছিলো।আমি বললাম এত বড় লিষ্ট দেয়া লাগবেনা।আরেহ আমার মনে থাকবে।এই বলে বাজার করতে গেলাম। বাজারে গিয়ে আলু আর পেয়াজ নেয়ার পর আমার কিছুই মনে আসতেছেনা।এত বড় তালিকার মাত্র দুইটা উপাদান মনে আছে এইটা ভাবতেও লজ্জা লাগে আমার।রিমুর সামনে বড় বড় কথা বলে আসছিলাম কিন্তু এখন গেলে তো সে অট্টহাসি দিয়ে আমার প্রেষ্টিজ এ আঘাত দিবে।কিন্তু কি আর করার নিজের বউ ই তো।তাই বাসায় গিয়ে এই দুই পদের বাজার তার সামনে দিলাম।সে বললো বাকি বাজার আনতে ভুলে গেছো তাই না?
আমি উত্তরে হ্যা বলতে না বলতেই সে শুরু করে দিলো তার প্রতিশোধের প্রতিটি ধাপ।
মরিচ আনতে ভুলে গেছি তাই মরিচের নামতা দশবার।
আদা আনতে ভুলে গেছি তাই আদার নামতা দশবার।
ফুলকপি,বাধাকপি,ঢেড়শ,করলা,টমেটোর নামতা দশবার দশবার করে পড়িয়েছে।এরপর আবার আমায় বাজারে পাঠিয়েছে।
ভার্সিটি ক্যাম্পাসে ওকে এই শাস্তি দিয়েছি জীবনে একবার। আর ও আমায় প্রতিনিয়ত একটা ভুল হলে সেটার শাস্তি কয়েকবার দেয়।রাগ ও করতে পারিনা তার সাথে।কারণ রান্না জানিনা, রাগ করলে আমার পেটের ক্ষিদা মিটবেনা। ক্ষমা চাইতে গেলে ক্ষমার নামতা দশবার পড়তে বলে।
র্যাগ শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ নয়।এটা যে কত বিশাল পরিধির তা আজ আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি আমার স্ত্রীর দ্বারা।


জহির রায়হান লিমন

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.