প্রতিদান
প্রতিদান
আমি কিন্তু চোর ছিলাম!
"এই নাও টাকা। যাও, ফরম ফিলআপ করো।" বাক্যটি গার্জিয়ানদের মতো শুনালেও আমি কিন্তু গার্জিয়ান নই, ছাত্র। তখন এস, এস, সি পরীক্ষার্থী ছিলাম।
মেধা এবং পারিবারিক স্বচ্ছলতা একই সাথে সব ছাত্র-ছাত্রীদের থাকে না। অস্বচ্ছল পরিবার থেকেই অধিকাংশ মেধাবীরা বেরিয়ে আসে। আমাদের ক্লাসের সবচে' সুন্দরী ছাত্রী মান্নাতের মেধা আছে, স্বচ্ছলতা ছিলো না। বই, খাতা, কলম, স্কুল-ফি, পোশাকাদি চলছিলো কোন্ রকম, কিন্তু ফরম ফিলআপ-এ এসে সে থেমে গিয়েছিলো।
যখন আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার সময়, তখন আমরা প্রেম করছি। আর যখন প্রেম করার সময়, তখন জীবনের উপসংহার টানছি! আমিও তাই করেছি। মান্নাতকে ভালোবেসেছি। সে-ও আমাকে ভালো বাসতো। তবে আমাদের ভবিষ্যৎ দু'জনের দু'রকম হয়েছে।
টাকা হাতে নিয়ে মান্নাত অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলো, "কোথায় পেলে?"
আমি বিজ্ঞের মতো বলেছিলাম, "তোমার কাজ হলো পথচলা। পথ চলবে। সেই পথ কে তৈরি করেছে, কিভাবে তৈরি করেছে সেটা তোমার না জানলেও চলবে।"
"তবুও, বলো।"
"আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, "শোনো, আমার কাছে টাকা কোনো বিষয় না। তোমার কাজ পড়ালেখা করা, পড়ালেখা করো। টাকার বিষয়টা আমি দেখবো।"
আমি নিজেই পুচকে একটা ছেলে! চলি গার্জিয়ানদের অর্থে। প্রয়োজনীয় খরচের চেয়ে বাড়তি টাকা কোথায় পাবো! তাই চুরি করেছিলাম আব্বার সিন্দুক থেকে। ওটাই ছিলো আমার জীবনের প্রথম চুরি। অনেক আগের কথা।
মান্নাতকে কলেজে ভর্তি করার সময় দ্বিতীয়বার চুরি করেছিলাম। মা'র স্বর্ণের একটি চেইন। কাঠি চেইন। দেখতে বেশ সুন্দর ছিলো।
আমি ছাত্র হিসাবে খুব ভালো না হলেও, মন্দ ছিলাম না। প্রাইভেট পড়ছি বলে আব্বার কাছ থেকে প্রতিমাসে দু'তিনটা প্রাইভেটের খরচ ঠিকই নিতাম, যদিও পড়তাম না একটাও। বই কেনা থেকে পোশাক পর্যন্ত সবই বেশি বেশি ভাউচার দিয়ে আব্বার কাছ থেকে টাকা আদায় করেছি। মিথ্যে বলায় পটুত্ব তখনই অর্জন করেছিলাম। মিথ্যে বলতে হয় সাবধানে, গুছিয়ে। কিন্তু সত্য কখনো গুছিয়ে বলতে হয় না। কেননা, সত্য সর্বদা গুছানোই থাকে।
মিথ্যে বলে টাকা নিয়েছি সত্য, কিন্তু বিলাসীতা করিনি। ভালো-মন্দ, ভুল-শুদ্ধ যাই হোক, যা করেছি আমার প্রিয় মানুষের জন্য করেছি। নিজে পড়াশুনো করেছি বন্ধুদের বই টানাহেঁচড়া করে। এক পোশাক যতোদূর চালানো যায়, চালিয়েছি। তাছাড়া পোশাক নতুন হওয়া তো জরুরী নয়, তবে পরিচ্ছন্ন হওয়া জরুরী। বহু বন্ধুদের দেখেছি সাধ-আহ্লাদ মিটিয়ে জীবনযাপন করতে। ভেবেছি, আগে ভবিষ্যৎ গড়ে নিই, মান্নাত পড়াশুনা শেষ করুক, ওর ইচ্ছে পূরণ হোক, একদিন সব হবে। আমরা হবো সুখী, স্বচ্ছল দম্পতি!
ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর আমাদের পেরেশানি কমে যায়। আমি একাধিক টিউশনি শুরু করি। অনার্স দ্বিতীয়বর্ষ থেকে মান্নাতও টিউশনি শুরু করে দেয়।
মান্নাতের শুধু মেধা ভালো নয়, ভাগ্যও ভালো। ইংরেজিতে অনার্স কমপ্লিট করার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে একটা ভালো চাকুরী পেয়ে যায়। তার কয়েক মাস পরেই সে বিয়েও করে!
বিয়ের পর কয়েক মাসে সে কয়েকবার ফোন দিয়ে আমার খোঁজ-খবর নিয়েছিলো। তারপর অনেক বছর হলো আর সৌজন্যতা রক্ষা করেনি। এতো বছরে জননী হয়েছে নিশ্চয়! স্বামী, সংসার, বাচ্চাকাচ্চা এতো সব ব্যস্ততায় আমাকে ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
মান্নাতের জন্য আমি যা কিছু করেছি মহৎ হওয়ার জন্য নয়, ভালোবাসা থেকে করেছি। আর মান্নাত যা করেছে তার কারণ আমি জানি না। জানতে কখনো ইচ্ছেও হয় না। তবে মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করে, সে কেমন আছে?
শিহাব আহমেদ

কোন মন্তব্য নেই